বেদের আলোকে গোহত্যা ও গোমাংস ভক্ষণ—এই বিষয়টি আজকের ভারতে এক গভীর সামাজিক, ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। আমরা যারা হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছি, তারা ছোটবেলা থেকেই জেনে এসেছি যে হিন্দু ধর্মের সবচেয়ে প্রাচীন ও পবিত্র গ্রন্থ হলো বেদ। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী বেদ অপৌরুষেয়—অর্থাৎ মানুষের রচিত নয়, ভগবান ব্রহ্মার মুখনিঃসৃত। তাই বেদকে নিত্য, শাশ্বত ও অভ্রান্ত বলে মনে করা হয়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধর্মীয় আচরণ, সামাজিক বিধান ও শাস্ত্রব্যাখ্যার মধ্যে যে পরিবর্তন এসেছে, তা এই প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে—বেদের দৃষ্টিতে গোমাংস আহার কি আদৌ নিষিদ্ধ ছিল?
আমরা যারা হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছি, তারা ছোটবেলা থেকেই জেনে এসেছি যে হিন্দু ধর্মের সবচেয়ে প্রাচীন ও পবিত্র গ্রন্থ হলো বেদ। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী বেদ অপৌরুষেয়—অর্থাৎ মানুষের রচিত নয়, ভগবান ব্রহ্মার মুখনিঃসৃত। তাই বেদকে নিত্য, শাশ্বত ও অভ্রান্ত বলে মনে করা হয়।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধর্মীয় আচরণ, সামাজিক বিধান ও শাস্ত্রব্যাখ্যার মধ্যে বড় পরিবর্তন এসেছে। সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে আলোচিত ও সংবেদনশীল একটি বিষয় হলো—গোহত্যা ও গোমাংস ভক্ষণ। সত্যিই কি বেদের দৃষ্টিতে গোমাংস আহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল? নাকি বাস্তবতা ছিল ভিন্ন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে বেদের মূল পাঠ ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে।
হিন্দু ধর্মে বেদের গুরুত্ব ও পবিত্রতা
হিন্দু ধর্মে বেদকে সর্বোচ্চ ধর্মগ্রন্থ হিসেবে মানা হয়। ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ ও অথর্ববেদ—এই চার বেদকে হিন্দু দর্শনের ভিত্তি বলা হয়। ধর্ম, যজ্ঞ, সমাজব্যবস্থা, জীবনাচার—সব কিছুরই মূল উৎস হিসেবে বেদের কথা বলা হয়।
তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। বেদকে পবিত্র মানা হলেও, বেদের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ যুগে যুগে ভিন্ন হয়েছে। সমাজের প্রয়োজন অনুযায়ী আচরণগত নিয়ম বদলেছে, কিন্তু মূল গ্রন্থ অপরিবর্তিত থেকেছে।
বর্তমান ভারতে গোহত্যা ও গোমাংস ভক্ষণ বিতর্কের প্রেক্ষাপট
আধুনিক ভারতে গোহত্যা ও গোমাংস ভক্ষণ একটি বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কের বিষয়। বহু রাজ্যে গোহত্যা আইনত নিষিদ্ধ, কোথাও কোথাও গোমাংস ভক্ষণও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
সাধারণভাবে এই নিষেধাজ্ঞার পক্ষে যে যুক্তি দেওয়া হয়, তা হলো—গো হিন্দুদের কাছে পবিত্র, তাই গোহত্যা হিন্দু ধর্মবিরোধী। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ধারণা কি সরাসরি বেদের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে? নাকি এটি পরবর্তী কালের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার ফল?
ঋগ্বেদের আলোকে গোহত্যা ও গোমাংস ভক্ষণ
ঋগ্বেদ পাঠ করলে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে বৈদিক সমাজে খাদ্য হিসেবে গো, মহিষ এবং অশ্বের মাংসের ব্যবহার অস্বাভাবিক ছিল না। বরং বহু ক্ষেত্রে তা প্রিয় খাদ্য হিসেবেই বিবেচিত হতো। বিশেষত ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের কয়েকটি ঋকে গোমাংস ভক্ষণ ও গোহত্যার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উল্লেখ পাওয়া যায়, যা এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
ঋগ্বেদের ১০/৮৯/১৪ নম্বর ঋকে ইন্দ্রের অস্ত্র দ্বারা রাক্ষস নিধনের তুলনা করা হয়েছে গোহত্যার স্থানের সঙ্গে। সেখানে বলা হয়েছে—
যেমন নির্দিষ্ট স্থানে গাভীগণ হত হয়, তেমনি ইন্দ্রের অস্ত্র দ্বারা শত্রুরা পৃথিবীতে পতিত হয়।
এই ঋকের টীকায় অনুবাদক রমেশ চন্দ্র দত্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, গোহত্যা যদি সমাজে প্রচলিত না থাকত, তবে তার জন্য আলাদা স্থানের উল্লেখ থাকার কোনো অর্থই হতো না। অর্থাৎ এটি একটি স্বীকৃত সামাজিক প্রথার ইঙ্গিত দেয়।
এছাড়া ঋগ্বেদের ১০/৮৬/১৩ নম্বর ঋকে ইন্দ্রের উদ্দেশে বৃষ ভক্ষণের কথা বলা হয়েছে। সেখানে বৃষাকপিবনিতিকে উদ্দেশ করে বলা হয়—তাঁর বৃষদের ইন্দ্র ভক্ষণ করুন এবং উৎকৃষ্ট হোমদ্রব্য গ্রহণ করুন। এই ঋক থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে বৃষ বা গরুর মাংস দেবতার ভোগ্য হিসেবেও ব্যবহৃত হতো।
এই বক্তব্য আরও স্পষ্ট হয় ঋগ্বেদের ১০/৮৬/১৪ নম্বর ঋকে, যেখানে পঞ্চদশ বা বিংশ বৃষ রান্না করার অনুরোধ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে—এই বৃষভক্ষণ দ্বারা শরীরের স্থূলতা বৃদ্ধি পায় এবং উদর পরিপূর্ণ হয়। এই বর্ণনা নিঃসন্দেহে গোমাংস ভোজনের বাস্তব ও স্বাভাবিক চিত্র তুলে ধরে।
ঋগ্বেদের ১০/৭৯/৬ নম্বর ঋকে অগ্নির উদ্দেশে বলা হয়েছে—যেমন খড়্গ দ্বারা গাভীকে খণ্ড খণ্ড করে কাটা হয়, তেমনি আহার্য ভোজনের সময় খাদ্যকে অংশে অংশে বিভক্ত করা হয়। এই ঋক থেকে অনুমান করা যায় যে খাদ্যের প্রয়োজনে গাভীকে পর্বে পর্বে কেটে ভোজন করা হত, যা গোমাংস আহারের একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত।
উল্লেখযোগ্য যে, উপরিউক্ত সমস্ত ঋকের টীকাসমূহ ঋগ্বেদের প্রখ্যাত অনুবাদক রমেশ চন্দ্র দত্ত প্রদত্ত। তাঁর ব্যাখ্যা অনুসারে, বৈদিক যুগে গোহত্যা ও গোমাংস ভক্ষণ কোনো ব্যতিক্রমী বা নিষিদ্ধ কাজ ছিল না, বরং তা সমাজজীবনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবেই বিবেচিত হতো।
কিছু ঋকে গোহত্যার জন্য নির্দিষ্ট স্থানের উল্লেখ আছে, যা থেকে বোঝা যায়—এই প্রথা সমাজে প্রচলিত ছিল। আবার কোথাও দেবতাদের উদ্দেশে পশু রান্না ও ভোজনের কথাও বলা হয়েছে। এসব বর্ণনা থেকে অনুমান করা যায় যে বৈদিক সমাজে গোমাংস আহার অস্বাভাবিক বা নিষিদ্ধ ছিল না।
ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক গল্প: একটি ইন্টারভিউ ও ডিজিটাল গভর্নেন্সের নির্মম সত্য
বৈদিক সমাজে খাদ্যাভ্যাস: গোমাংস, মহিষ ও অশ্বের ব্যবহার
বৈদিক সমাজ মূলত ছিল যজ্ঞকেন্দ্রিক। যজ্ঞে বিভিন্ন পশু আহুতি দেওয়া হতো এবং যজ্ঞশেষে সেই আহার সমাজে ভোজন করা হত। শুধু গরু নয়, মহিষ ও অশ্বের মাংসও খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হতো বলে বৈদিক সাহিত্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
এতে স্পষ্ট হয় যে সেই সময় খাদ্যাভ্যাস আজকের মতো ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞায় আবদ্ধ ছিল না। জীবনযাপন ছিল অনেক বেশি বাস্তববাদী ও পরিবেশ-নির্ভর।
যজুর্বেদ ও গৃহ্যসূত্রে গোমাংস ভোজনের নির্দেশ
যজুর্বেদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গৃহ্যসূত্রগুলোতে অতিথি আপ্যায়নের বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশ পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়েছে, গৃহে অতিথি এলে তাকে যথোচিত সম্মান দিতে হবে, এমনকি গোমাংস পরিবেশন করেও।
এই নির্দেশ শুধু অতিথির জন্য নয়, সঙ্গে ব্রাহ্মণদের আহ্বান করে ভোজের কথাও বলা হয়েছে। অর্থাৎ গোমাংস ভক্ষণকে তখন ধর্মবিরোধী নয়, বরং সামাজিক দায়িত্ব হিসেবেই দেখা হতো।
স্বামী বিবেকানন্দের দৃষ্টিতে গোহত্যা ও গোমাংস ভক্ষণ
স্বামী বিবেকানন্দ এই বিষয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট বক্তব্য রেখেছেন। তিনি বলেছেন, বেদ পাঠ করলে বোঝা যায় যে একসময় গোহত্যা ও গোমাংস ভোজন সমাজে প্রচলিত ছিল, বিশেষ করে অতিথি আপ্যায়নের ক্ষেত্রে।
তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন যে, পরবর্তীকালে ভারতীয় সমাজ কৃষিনির্ভর হয়ে ওঠায় গরুর অর্থনৈতিক গুরুত্ব বেড়ে যায়। ভালো ষাঁড় ও গাভী হত্যা করলে কৃষিব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতো। এই বাস্তবতা থেকেই ধীরে ধীরে গোহত্যাকে মহাপাতক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
অর্থাৎ এটি ছিল ধর্মীয় পরিবর্তনের চেয়ে সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রয়োজনের ফল।
বেদ, স্মৃতি ও যুগপরিবর্তন: শাস্ত্রের ব্যাখ্যার বিবর্তন
স্বামী বিবেকানন্দ পরিষ্কারভাবে বলেছেন—বেদ চিরকাল একরূপ থাকবে, কিন্তু স্মৃতি ও সামাজিক বিধান যুগে যুগে বদলাবে। সমাজের প্রয়োজন অনুযায়ী ধর্মীয় আচরণও পরিবর্তিত হবে।
এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে বোঝা যায়, আজ যে গোহত্যা নিষিদ্ধ বলে বিবেচিত, তা বেদের সরাসরি নির্দেশ নয়; বরং পরবর্তী কালের সামাজিক সিদ্ধান্ত।
উপসংহার: বেদের বাণী ও সমসাময়িক সামাজিক বাস্তবতা
বেদের আলোকে বিচার করলে স্পষ্ট হয় যে বৈদিক যুগে গোহত্যা ও গোমাংস ভক্ষণ নিষিদ্ধ ছিল না। বরং তা সমাজজীবনের একটি স্বাভাবিক অংশ ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কৃষিভিত্তিক সমাজ, অর্থনৈতিক প্রয়োজন ও নৈতিক বিবেচনা থেকে এই বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে।
আজকের ভারতে গোহত্যা ও গোমাংস ভক্ষণ নিয়ে যে সাম্প্রদায়িক ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে, তার সমাধান খুঁজতে হলে ইতিহাস ও শাস্ত্রকে আবেগ নয়, যুক্তির আলোকে বুঝতে হবে।
বেদের বাণী শিরোধার্য হলে হয়তো আমরা আরও সহনশীল, বাস্তববাদী ও মানবিক পথের সন্ধান পেতে পারি।
