145dba
বাংলা খবর

দল নেই তো বল নেই : একাকিত্ব কেন মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু

Pinterest Telegram WhatsApp

দল নেই তো বল নেই—এই কথাটা শুধু প্রবাদ নয়, মানুষের জীবন আর টিকে থাকার সবচেয়ে বড় সত্য। মানুষ একা বাঁচার জন্য তৈরি হয়নি। শক্তি, সাহস বা বুদ্ধি—সব কিছুর আসল মানে তৈরি হয় তখনই, যখন তার পাশে থাকে আরেকজন মানুষ। ইতিহাস বলে, বিবর্তনও তাই শেখায়—যে মানুষ দল বেঁধে থাকতে পেরেছে, সেই মানুষই টিকে গেছে। আর যে একা হয়ে পড়েছে, সে ধীরে ধীরে দুর্বল হয়েছে—মনে, শরীরে, সমাজে। আজকের আধুনিক জীবনে দাঁড়িয়ে আমরা এই সত্যটাই সবচেয়ে বেশি ভুলে যাচ্ছি।

“একসময় মানুষের ৬টি প্রজাতি ছিল, যার পাঁচটি পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। থেকে গেছে মাত্র একটি প্রজাতি – হোমো স্যাপিয়ান্স। কেন হোমো স্যাপিয়ান্স প্রজাতিটি টিকে গেলো আর অনেক বড়ো আকৃতির এবং অনেক বেশি শক্তিশালী “নিয়ান্ডারথাল” নামক মানুষের প্রজাতিটি বিলুপ্ত হয়ে গেলো? তার কারণ খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা বলছেন – তার প্রধান একটি কারণ হচ্ছে নিয়ান্ডারথাল মানুষ ছিল মূলত “সলিটারি” – মানে তারা একা একা বাঁচতে পছন্দ করতো। অন্যদিকে হোমো স্যাপিয়ান্স প্রজাতিটি সব সময় দল বেঁধে থাকতো।

জীব জগতে এটি নতুন কিছু নয়। একদিকে লেপার্ড যেমন সলিটারি আনিম্যাল, অন্যদিকে সিংহ, হায়েনারা থাকে দল বেঁধে। দল বেঁধে থাকার সুবিধে হলো – সেফটি ইন নাম্বারস। মানে একজন বিপদে পড়লে বাকিরা তাকে সাহায্য করতে পারে। সলিটারি আনিম্যালদের ক্ষেত্রে তেমনটা ঘটে না। ঠিক এই কারণেই হোমো স্যাপিয়ান্সরা একসময় দল বেঁধে মেরে শেষ করেছিল অনেক বেশি শক্তিশালী কিন্তু সলিটারি নিয়ান্ডারথাল প্রজাতিকে। নিয়ান্ডারথালরা সলিটারি প্রাণী হওয়ায় তারা তেমন প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি। তাছাড়া দল বেঁধে থাকায় স্যাপিয়ান্স প্রজাতিটির খাদ্যের অভাব হয়নি এবং মহিলা, শিশু ও অসুস্থরা প্রয়োজনীয় প্রোটেকশন পেয়েছে।

ছেলেদের দায়িত্বশীল করে গড়ে তোলা: কেন সময়মতো কঠোরতা না থাকলে পুরুষ তৈরি হয় না

কিন্তু ঘোর নগরকেন্দ্রিক জীবনে এসে আমরা ক্রমশ ভুলে যাচ্ছি যে হোমো স্যাপিয়ান্স প্রজাতিটি সংঘবন্ধ জীব। নেচারে আমরা যে এখনো বিলুপ্ত হইনি তার কারণ আমরা দল বেঁধে ছিলাম। একা বাঁচার জন্য আমাদের তৈরী করা হয়নি। কাজেই মানুষ কোনো কারণে একা হয়ে গেলে, নেচার শারীরবৃত্তীয়ভাবে মানুষকে ফাইটিং মোডে নিয়ে যায়। একাকিত্বে ভোগা মানুষের উপর স্টাডি করে দেখা গেছে যে তাদের প্রেসার বেশি, সুগার লেভেল বেশি এবং হার্টবিটও বেশি। মানুষ তখন অপরিচিতদের থ্রেট হিসেবে দেখতে শুরু করে। তার থেকে একটি ভিসিয়াস সাইকেল তৈরী হয়। মানুষের ইমিউনিটি কমে যায়, ইনফ্লামেশন বেড়ে যায়, হার্ট ডিসিস, স্ট্রোক এবং প্রিম্যাচিওর ডেথের চান্স বেড়ে যায় প্রায় ৫৮% !

স্টাডি বলছে, বর্তমান পৃথিবীতে ৩৩% মানুষ একাকিত্বে ভোগেন – মানে প্রত্যেক তিনজনের একজন। তারা কিন্তু সবাই বয়স্ক নন। সবচেয়ে বেশি একাকী মানুষ থাকেন ব্রাজিলে, তারপর তুরস্ক এবং তৃতীয় স্থানে রয়েছে ভারত ! ডিমেনশিয়া, আলজাইমার, ডিপ্রেশন ভারতে যে প্রায় মহামারীর আকার ধারণ করেছে তার অন্যতম কারণ এই একাকিত্ব। সাইকোলজিস্টরা বলছেন একাকিত্ব মানে কিন্তু একা থাকা নয়। একাকিত্ব একটি “স্টেট অফ মাইন্ড” যেখানে মানুষটির মনে হচ্ছে সে একা, নির্বান্ধব, মন খুলে দুটি কথা বলার যার কেউ নেই।

তাহলে উপায় ? এই নিয়ে একটি সেমিনার অ্যাটেন্ড করলাম সেখানে ভারত-আমেরিকা -ইংল্যান্ডের নামকরা ডাক্তারবাবুরা নিদান দিলেন আরো বেশি বেশি “সোশ্যাল ইন্টারঅ্যাকশন এবং সোশ্যাল কানেক্ট” তৈরী করার। তারা বললেন হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের খুঁজে বের করে তাদের সঙ্গে দেখা করার। সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে বন্ধু সার্কেলকে বাড়ানো এবং রিয়েল ওয়ার্ল্ডে তাদের সঙ্গে বেশি বেশি সোশালাইজ করার।
কে জানতো, ছেলে-বুড়োদের সকাল-সন্ধেতে চায়ের দোকানের আড্ডা বা পাড়ার কাকিমা-জ্যেঠিমাদের “পাড়া বেড়ানো” বস্তুটিই আসলে সুস্থ থাকার চাবিকাঠি !

এই সেমিনারে এক বয়স্ক ভদ্রলোক নিজের জীবনের কথা বললেন। স্ত্রী মারা যাবার পর তিনি নিদারুন একাকিত্বে ভোগেন এবং ২০১৯ তে তার স্টেজ ওয়ান ক্যান্সার ধরা পড়ে। ভদ্রলোক তখন “আর ক’দিনই বা বাঁচবো, যাবার আগে সবার সঙ্গে দেখা করে যাই” মোডে চলে গিয়ে খুঁজে খুঁজে তার হারিয়ে যাওয়া আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং নিজের বাড়িতে তাদের ডেকে নিয়ে সকাল-সন্ধে আড্ডা বসান। ভদ্রলোক যে শুধু ক্যান্সার সারভাইভ করেছেন তাই নয়, তিনি বললেন আমি এখন মানসিক ভাবে সম্পূর্নই সুস্থ। মজা করে আরো বললেন, বাড়িতে আড্ডা বসানোয় চা, সিঙ্গাড়া, মিষ্টি দিয়ে আতিথেয়তায় তার যে খরচ হয় সেটি ওষুধের খরচের ৩০%-ও নয়*। ওটাকে তিনি ভালো থাকার ইনভেস্টমেন্ট হিসেবেই দেখেন !

রবি ঠাকুর সেই কবেই লিখে গেছেন “আরেকটিবার আয় রে সখা, প্রাণের মাঝে আয় / মোরা সুখের-দুখের কথা কব, প্রাণ জুড়াবে তায়” – ডিপ্রেশন ও নানাবিধ সাইকোলজিক্যাল রোগ থেকে বাঁচতে সোশ্যাল ইন্টারঅ্যাকশনের মাধ্যমে এই “প্রাণ জুড়োনোর” কোনো বিকল্প কিন্তু ডাক্তারবাবুরাও দিতে পারছেন না কেননা নেচার, হোমো স্যাপিয়ান্স প্রজাতিকে সেভাবে বানায়নি।”……

তাই আসুন ব‍্যবসাটা নিয়ে আরও উঠে পড়ে লাগি। রোজ নতুন নতুন মানুষের সঙ্গে মিশি। ইউনিটি না থাকলে ইমিউনিটিও কমে যায়। চলুন দল বেঁধে আনন্দ করতে করতে জীবনটাকে এঞ্জয় করি আর সকলের স্বপ্ন পূরণ করি। আজ থেকেই শুরু হয়ে যাক। মনে রাখবেন, হোমো স‍্যাপিয়েন্স হল মানুষের শেষ প্রজাতি। এদের, মানে আমাদের বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব কিন্তু আমাদেরই।
সুতরাং যদি-

প্রাণ ভরে বাঁচতে চাও
দল বাঁধো তৈরি হও

লেখক – পরাশর বন্দ্যোপাধ্যায়।

Write A Comment