145dba
অজানা তথ্য

ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস: কিছু অজানা তথ্য

Pinterest Telegram WhatsApp

ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস ভারতীয় ইতিহাসের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন। প্রতি বছর ২৬ জানুয়ারি এই দিনটি পালিত হয়, কারণ ১৯৫০ সালের এই দিনেই ভারতের সংবিধান কার্যকর হয় এবং দেশ একটি সার্বভৌম, গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই দিনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের শাসনভার জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ন্যস্ত হয় এবং আইনের ঊর্ধ্বে কেউ থাকে না। প্রজাতন্ত্র দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে স্বাধীনতা শুধু অর্জন নয়, বরং সংবিধান মেনে চলা, অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে প্রতিদিন চর্চা করাই হলো প্রকৃত প্রজাতন্ত্রের অর্থ।

নীচে ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস এর সঙ্গে যুক্ত কিছু কম-জানা কিন্তু ভালোভাবে নথিভুক্ত গল্প তুলে ধরা হলো। এগুলো কল্পকাহিনি নয়—সবই সরকারি দলিল, সংবিধান সভার বিতর্ক, স্মৃতিকথা ও স্বীকৃত ঐতিহাসিক গবেষণার ওপর ভিত্তি করে।

১. সংবিধানে স্বাক্ষর ২৬ জানুয়ারি হয়নি

অনেকেই মনে করেন ২৬ জানুয়ারি দিনটিতেই ভারতের সংবিধানে স্বাক্ষর হয়েছিল। বাস্তবটা তা নয়।

ভারতের সংবিধান গৃহীত হয় ২৬ নভেম্বর ১৯৪৯
সংবিধান সভার সদস্যরা এতে স্বাক্ষর করেন ২৪ জানুয়ারি ১৯৫০ থেকে শুরু করে কয়েক দিনের মধ্যে

তাহলে ২৬ জানুয়ারি কেন?

কারণ এই দিনটি স্মরণ করে Indian National Congress–এর ২৬ জানুয়ারি ১৯৩০-এর ‘পূর্ণ স্বরাজ’ ঘোষণা, যেদিন প্রথমবার ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস সম্পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি প্রকাশ্যে জানানো হয়েছিল।

সূত্র:
Constituent Assembly Debates, Vol. XI
Granville Austin, The Indian Constitution: Cornerstone of a Nation

২. প্রথম প্রজাতন্ত্র দিবসে কোনো প্যারেড ছিল না

আজকের রাজপথের জাঁকজমকপূর্ণ প্যারেড প্রথম দিন থেকেই ছিল—এটা ভুল ধারণা।

২৬ জানুয়ারি ১৯৫০-এ অনুষ্ঠান ছিল অত্যন্ত সংযত।

Rajendra Prasad শপথ নেন গভর্নমেন্ট হাউসে (আজকের রাষ্ট্রপতি ভবন)।
না ছিল ট্যাঙ্ক, না ছিল ফ্লাইপাস্ট, না ছিল বড় কোনো প্রদর্শনী।
বর্তমান রূপের ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস প্যারেড শুরু হয় ১৯৫৫ সালে, যখন নতুন রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণভাবে নিজের পরিচয় দৃঢ়ভাবে তুলে ধরতে চায়।

সূত্র:
Press Information Bureau (PIB) আর্কাইভ
Ramachandra Guha, India After Gandhi

৩. সংবিধান টাইপ করা হয়নি—হাতে লেখা হয়েছিল

ভারতের সংবিধান কোনো প্রিন্টিং প্রেসে তৈরি হয়নি।
পুরো সংবিধানটি হাতে লিখেছিলেন Prem Behari Narain Raizada। সময় লেগেছিল প্রায় পাঁচ বছর।

দুটি কম-জানা তথ্য:
তিনি কোনো পারিশ্রমিক নেননি
প্রতিটি পাতায় নিজের নাম লিখেছেন—পাতা যত এগিয়েছে, সই তত ছোট হয়েছে

চিত্রাঙ্কনের দায়িত্বে ছিলেন Nandalal Bose, যিনি অজন্তা গুহাচিত্র, লোকশিল্প ও ধ্রুপদি ভারতীয় মোটিফ ব্যবহার করেন। ফলে সংবিধান হয়ে ওঠে শুধু আইনি নয়, সাংস্কৃতিক দলিলও।

সূত্র:
National Archives of India
B. Shiva Rao, The Framing of India’s Constitution

৪. একসময় প্রজাতন্ত্র দিবস ছিল প্রতিবাদের দিন

শুরুর দিকে ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস ২৬ জানুয়ারি সবার কাছে উৎসবের দিন ছিল না।
১৯৫০-এর দশকে বামপন্থী দল ও ভাষাভিত্তিক আন্দোলনের গোষ্ঠীগুলো এই দিনটিকে ব্যবহার করত প্রতিবাদের জন্য—

অতিরিক্ত কেন্দ্রীয়করণের বিরুদ্ধে
ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠনের দাবিতে
অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রশ্নে

তাদের কাছে প্রজাতন্ত্র দিবস মানে ছিল এই স্মরণ—
রাজনৈতিক স্বাধীনতা এলেও সামাজিক ন্যায় তখনও অসম্পূর্ণ।

এই প্রতিবাদগুলোর উল্লেখ আছে পুলিশ রিপোর্ট, সংবাদপত্র ও সংসদীয় বিতর্কে, কিন্তু পাঠ্যবইয়ে প্রায় নেই।

সূত্র:
Lok Sabha Debates (1950–1956)
The Hindu আর্কাইভ
Christophe Jaffrelot, India’s Silent Revolution

৫. রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত রাখা হয়েছিল—ইচ্ছাকৃতভাবেই

ভারত ইচ্ছে করেই শক্তিশালী রাষ্ট্রপতি ব্যবস্থা বেছে নেয়নি।
সংবিধান প্রণয়নের সময় কেউ কেউ আমেরিকার মতো শক্তিশালী প্রেসিডেন্ট চাইছিলেন।
কিন্তু B. R. Ambedkar স্পষ্টভাবে এর বিরোধিতা করেন।

তার যুক্তি ছিল সরাসরি—
ঔপনিবেশিক শাসন থেকে বেরোনো দেশের জন্য ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ বিপজ্জনক।

তাই ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস কেবল ক্ষমতার বদল নয়, বরং ক্ষমতার প্রতি সচেতন অবিশ্বাসের প্রতীক।

সূত্র:
Constituent Assembly Debates, Vol. VII
Granville Austin

প্রজাতন্ত্র দিবস আমাদের কী মনে করিয়ে দেয়

প্রজাতন্ত্র দিবসের মূল শিক্ষা খুব সরল, কিন্তু গভীর—
ক্ষমতা শাসকের নয়, সংবিধানের
রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তির সম্পত্তি নয়
নাগরিক প্রশ্ন করতে পারে, মতভেদ রাখতে পারে

এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—
স্বাধীনতা একদিনে আসে, কিন্তু প্রজাতন্ত্র প্রতিদিন চর্চা করতে হয়।

শেষ কথা

প্রজাতন্ত্র দিবস মানে শুধু পতাকা ও কুচকাওয়াজ নয়।
এটা হলো সেই অঙ্গীকার,
যেখানে ভারত বলেছিল—

আমরা শাসিত হব না ইচ্ছেমতো,
শাসিত হব নীতির দ্বারা,
আর সেই নীতি লেখা থাকবে সংবিধানে।

Write A Comment