বিনায়ক দামোদর সাভারকরের মূল আবেদন: অনুবাদসহ উদ্ধৃতি
এখানে “শোনা কথা” নয়। কোনো অলংকার নয়, ডকুমেন্ট যা বলে তাই। এগুলো আর্কাইভে সংরক্ষিত আবেদনপত্র থেকে নেওয়া, যেগুলি নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিতর্ক নেই।
✦ আবেদন: ১৯১১ (আন্দামান সেলুলার জেল)
মূল ইংরেজি (excerpt):
“If the Government in their manifold beneficence and mercy release me, I for one cannot but be the staunchest advocate of constitutional progress and loyalty to the British Government…”
বাংলা অনুবাদ:
“সরকার যদি তাদের বহুমুখী দয়া ও করুণার দ্বারা আমাকে মুক্তি দেন, তবে আমি সংবিধানসম্মত অগ্রগতির এবং ব্রিটিশ সরকারের প্রতি আনুগত্যের সবচেয়ে দৃঢ় সমর্থক হতে বাধ্য থাকব।”[^1]
✦ আবেদন: ১৯১৩
মূল ইংরেজি (excerpt):
“I am ready to serve the Government in any capacity they like… I beg to submit that my conversion is conscientious.”
বাংলা অনুবাদ:
“সরকার যে কোনো রূপে চাইলে আমি তাদের সেবা করতে প্রস্তুত… বিনীতভাবে জানাচ্ছি, আমার এই পরিবর্তন আন্তরিক।”[^2]
✦ আবেদন: ১৯২০ (মুক্তির ঠিক আগে)
মূল ইংরেজি (excerpt):
“I hereby promise to abstain from politics and remain loyal to the British Crown.”
বাংলা অনুবাদ:
“আমি এই মর্মে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যে রাজনীতি থেকে বিরত থাকব এবং ব্রিটিশ রাজমুকুটের প্রতি অনুগত থাকব।”[^3]
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম শুধু কয়েকজন নেতার নাম নয়, এটি লাখো মানুষের ত্যাগের ইতিহাস। সেই ইতিহাসে খান আব্দুল গফফার খান এক উজ্জ্বল নাম। মুসলিম হয়েও তিনি ছিলেন একান্তভাবে ভারতপ্রাণ। অহিংসা, সাহস আর মানবিকতার মাধ্যমে তিনি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন আজীবন।
জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড ও খান আব্দুল গফফার খানের সাহসী বক্তব্য
১৯১৯ সালের জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড ভারতের ইতিহাসে এক ভয়াবহ অধ্যায়। নিরীহ মানুষদের উপর গুলি চালিয়ে ব্রিটিশ সরকার নির্মমতা দেখিয়েছিল।
জেনারেল ডায়ারের নির্দেশ ও নিরীহ মানুষের উপর গুলি
জেনারেল ডায়ারের নির্দেশে সভায় জড়ো হওয়া হাজারো মানুষের উপর এলোপাথাড়ি গুলি চালানো হয়। নারী, পুরুষ, শিশু—কেউই রেহাই পায়নি।
পোস্টমর্টেম রিপোর্টে পিঠে গুলির চিহ্ন না থাকার সত্য
খান আব্দুল গফফার খান তখন জেনারেল ডায়ারকে চ্যালেঞ্জ করে বলেন— “তুমি যদি একজন মুসলিম শহীদের পিঠে গুলির চিহ্ন দেখাতে পারো, আমি স্বাধীনতার লড়াই ছেড়ে দেব।”
বুকে গুলি লাগা শহীদদের সত্য ইতিহাস
টানা দু’দিনে ৭৬টি লাশের পোস্টমর্টেম হয়। একটিও লাশের পিঠে গুলির চিহ্ন পাওয়া যায়নি। সবাই শহীদ হয়েছেন বুকে গুলি নিয়ে। এতে প্রমাণ হয়—তাঁরা পিছু হটেননি, সামনে দাঁড়িয়ে লড়াই করেছিলেন।
হিন্দু-মুসলিম ঐক্য ও ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা
খান আব্দুল গফফার খান ছিলেন হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের জীবন্ত প্রতীক।
মুসলিম হয়েও ভারতীয় জাতীয়তাবাদের প্রতীক
তিনি বিশ্বাস করতেন, ধর্ম আলাদা হতে পারে, কিন্তু দেশ এক। তাই তিনি হিন্দু-মুসলিম সবাইকে নিয়ে স্বাধীনতার আন্দোলনকে শক্তিশালী করেছিলেন।
সীমান্ত গান্ধী হিসেবে খ্যাতি পাওয়ার কারণ
অহিংসা, শৃঙ্খলা ও সত্যের পথে চলার জন্য মানুষ তাঁকে “সীমান্ত গান্ধী” নামে ডাকত। তিনি মহাত্মা গান্ধীর আদর্শে অনুপ্রাণিত ছিলেন।
ইন্দিরা গান্ধী ও খান আব্দুল গফফার খানের আবেগঘন সাক্ষাৎ
স্বাধীনতার পরে তাঁর চিকিৎসার প্রয়োজন হলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে ভারতে আমন্ত্রণ জানান।
অসুস্থ অবস্থায় ভারতে আমন্ত্রণ
ইন্দিরা গান্ধী নিজে উদ্যোগ নিয়ে তাঁকে দিল্লিতে আনেন চিকিৎসার জন্য।
বিমানবন্দরে আবেগঘন মুহূর্ত
প্রধানমন্ত্রী নিজে বিমানবন্দরে গিয়ে তাঁকে স্বাগত জানান। তাঁর ব্যাগ নিজ হাতে তুলতে গেলে খান সাহেব মজা করে বলেন, “সব তো নিয়ে নিলে মা, এটাও নেবে?”
ইন্দিরা গান্ধীর চোখে জল আসার ঘটনা
এই কথা শুনে ইন্দিরা গান্ধীর চোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে। সেই মুহূর্তে বোঝা যায়—দেশভাগ হলেও ভালোবাসা ভাগ হয়নি।
ভারত ভাগ ও খাইবারে থেকে যাওয়া এক ভারতপ্রাণ মানুষের যন্ত্রণা
দেশভাগের পর তিনি ভারতের বাইরে, খাইবার অঞ্চলে থেকে যান।
এক রাতে পাকিস্তানি হয়ে যাওয়া এক ভারতপ্রাণ মানুষ
যিনি মনে-প্রাণে ভারতীয়, এক রাতে ভাগ্যের নিষ্ঠুরতায় তিনি পাকিস্তানি হয়ে যান।
মাতৃভূমি থেকে বিচ্ছেদের যন্ত্রণা
দেশের জন্য জীবন দেওয়া মানুষটির জন্য এ ছিল সবচেয়ে বড় কষ্ট।
খান আব্দুল গফফার খানের ত্যাগ ও আজকের প্রজন্মের জন্য বার্তা
৩৫ বছর জেল জীবন ও আত্মত্যাগ
তিনি প্রায় ৩৫ বছর জেল খেটেছেন। কোনো লোভ, কোনো ভয় তাঁকে থামাতে পারেনি।
ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম
কারাগারে থেকেও তাঁর মনোবল ভাঙেনি। তিনি আজীবন সত্য ও অহিংসার পথে ছিলেন।
আজকের প্রজন্মের জন্য শিক্ষা
আজ যারা ইতিহাস জানে না, তাদের জানা দরকার— স্বাধীনতা এসেছে রক্ত, ত্যাগ আর হিন্দু-মুসলিম একতার মাধ্যমে।
ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস ভারতীয় ইতিহাসের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন। প্রতি বছর ২৬ জানুয়ারি এই দিনটি পালিত হয়, কারণ ১৯৫০ সালের এই দিনেই ভারতের সংবিধান কার্যকর হয় এবং দেশ একটি সার্বভৌম, গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই দিনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের শাসনভার জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ন্যস্ত হয় এবং আইনের ঊর্ধ্বে কেউ থাকে না। প্রজাতন্ত্র দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে স্বাধীনতা শুধু অর্জন নয়, বরং সংবিধান মেনে চলা, অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে প্রতিদিন চর্চা করাই হলো প্রকৃত প্রজাতন্ত্রের অর্থ।
নীচে ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস এর সঙ্গে যুক্ত কিছু কম-জানা কিন্তু ভালোভাবে নথিভুক্ত গল্প তুলে ধরা হলো। এগুলো কল্পকাহিনি নয়—সবই সরকারি দলিল, সংবিধান সভার বিতর্ক, স্মৃতিকথা ও স্বীকৃত ঐতিহাসিক গবেষণার ওপর ভিত্তি করে।
১. সংবিধানে স্বাক্ষর ২৬ জানুয়ারি হয়নি
অনেকেই মনে করেন ২৬ জানুয়ারি দিনটিতেই ভারতের সংবিধানে স্বাক্ষর হয়েছিল। বাস্তবটা তা নয়।
ভারতের সংবিধান গৃহীত হয় ২৬ নভেম্বর ১৯৪৯। সংবিধান সভার সদস্যরা এতে স্বাক্ষর করেন ২৪ জানুয়ারি ১৯৫০ থেকে শুরু করে কয়েক দিনের মধ্যে।
তাহলে ২৬ জানুয়ারি কেন?
কারণ এই দিনটি স্মরণ করে Indian National Congress–এর ২৬ জানুয়ারি ১৯৩০-এর ‘পূর্ণ স্বরাজ’ ঘোষণা, যেদিন প্রথমবার ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস সম্পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি প্রকাশ্যে জানানো হয়েছিল।
সূত্র: Constituent Assembly Debates, Vol. XI Granville Austin, The Indian Constitution: Cornerstone of a Nation
২. প্রথম প্রজাতন্ত্র দিবসে কোনো প্যারেড ছিল না
আজকের রাজপথের জাঁকজমকপূর্ণ প্যারেড প্রথম দিন থেকেই ছিল—এটা ভুল ধারণা।
২৬ জানুয়ারি ১৯৫০-এ অনুষ্ঠান ছিল অত্যন্ত সংযত।
Rajendra Prasad শপথ নেন গভর্নমেন্ট হাউসে (আজকের রাষ্ট্রপতি ভবন)। না ছিল ট্যাঙ্ক, না ছিল ফ্লাইপাস্ট, না ছিল বড় কোনো প্রদর্শনী। বর্তমান রূপের ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস প্যারেড শুরু হয় ১৯৫৫ সালে, যখন নতুন রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণভাবে নিজের পরিচয় দৃঢ়ভাবে তুলে ধরতে চায়।
সূত্র: Press Information Bureau (PIB) আর্কাইভ Ramachandra Guha, India After Gandhi
৩. সংবিধান টাইপ করা হয়নি—হাতে লেখা হয়েছিল
ভারতের সংবিধান কোনো প্রিন্টিং প্রেসে তৈরি হয়নি। পুরো সংবিধানটি হাতে লিখেছিলেন Prem Behari Narain Raizada। সময় লেগেছিল প্রায় পাঁচ বছর।
দুটি কম-জানা তথ্য: তিনি কোনো পারিশ্রমিক নেননি প্রতিটি পাতায় নিজের নাম লিখেছেন—পাতা যত এগিয়েছে, সই তত ছোট হয়েছে
চিত্রাঙ্কনের দায়িত্বে ছিলেন Nandalal Bose, যিনি অজন্তা গুহাচিত্র, লোকশিল্প ও ধ্রুপদি ভারতীয় মোটিফ ব্যবহার করেন। ফলে সংবিধান হয়ে ওঠে শুধু আইনি নয়, সাংস্কৃতিক দলিলও।
সূত্র: National Archives of India B. Shiva Rao, The Framing of India’s Constitution
৪. একসময় প্রজাতন্ত্র দিবস ছিল প্রতিবাদের দিন
শুরুর দিকে ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস ২৬ জানুয়ারি সবার কাছে উৎসবের দিন ছিল না। ১৯৫০-এর দশকে বামপন্থী দল ও ভাষাভিত্তিক আন্দোলনের গোষ্ঠীগুলো এই দিনটিকে ব্যবহার করত প্রতিবাদের জন্য—
অতিরিক্ত কেন্দ্রীয়করণের বিরুদ্ধে ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠনের দাবিতে অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রশ্নে
তাদের কাছে প্রজাতন্ত্র দিবস মানে ছিল এই স্মরণ— রাজনৈতিক স্বাধীনতা এলেও সামাজিক ন্যায় তখনও অসম্পূর্ণ।
এই প্রতিবাদগুলোর উল্লেখ আছে পুলিশ রিপোর্ট, সংবাদপত্র ও সংসদীয় বিতর্কে, কিন্তু পাঠ্যবইয়ে প্রায় নেই।
সূত্র: Lok Sabha Debates (1950–1956) The Hindu আর্কাইভ Christophe Jaffrelot, India’s Silent Revolution
৫. রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত রাখা হয়েছিল—ইচ্ছাকৃতভাবেই
ভারত ইচ্ছে করেই শক্তিশালী রাষ্ট্রপতি ব্যবস্থা বেছে নেয়নি। সংবিধান প্রণয়নের সময় কেউ কেউ আমেরিকার মতো শক্তিশালী প্রেসিডেন্ট চাইছিলেন। কিন্তু B. R. Ambedkar স্পষ্টভাবে এর বিরোধিতা করেন।
তার যুক্তি ছিল সরাসরি— ঔপনিবেশিক শাসন থেকে বেরোনো দেশের জন্য ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ বিপজ্জনক।
তাই ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস কেবল ক্ষমতার বদল নয়, বরং ক্ষমতার প্রতি সচেতন অবিশ্বাসের প্রতীক।
সূত্র: Constituent Assembly Debates, Vol. VII Granville Austin
প্রজাতন্ত্র দিবস আমাদের কী মনে করিয়ে দেয়
প্রজাতন্ত্র দিবসের মূল শিক্ষা খুব সরল, কিন্তু গভীর— ক্ষমতা শাসকের নয়, সংবিধানের রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তির সম্পত্তি নয় নাগরিক প্রশ্ন করতে পারে, মতভেদ রাখতে পারে
এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়— স্বাধীনতা একদিনে আসে, কিন্তু প্রজাতন্ত্র প্রতিদিন চর্চা করতে হয়।
শেষ কথা
প্রজাতন্ত্র দিবস মানে শুধু পতাকা ও কুচকাওয়াজ নয়। এটা হলো সেই অঙ্গীকার, যেখানে ভারত বলেছিল—
আমরা শাসিত হব না ইচ্ছেমতো, শাসিত হব নীতির দ্বারা, আর সেই নীতি লেখা থাকবে সংবিধানে।
হিমু ভারতের নেপোলিয়ন—এই নামটা আজও ইতিহাসে বিতর্ক আর বিস্ময়ের জন্ম দেয়। ১৬শ শতকের মধ্যভাগে, যখন উত্তর ভারতে মুঘল শক্তি আবার পা জমাতে চাইছে, তখন এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া মানুষ মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে দিল্লির সিংহাসনে বসেছিলেন। তিনি ছিলেন হেমচন্দ্র বিক্রমাদিত্য, ইতিহাসে যিনি পরিচিত হিমু ভারতের নেপোলিয়ন নামে। কিন্তু ভাগ্যের এক মুহূর্তের ভুল, একটি তীর—সবকিছু বদলে দেয়।
হিমু ভারতের নেপোলিয়ন কে ছিলেন? (সংক্ষিপ্ত পরিচয়)
হেমচন্দ্র ওরফে হিমুর জন্ম বর্তমান হরিয়ানার রিওয়ারি অঞ্চলে। পরিবার ছিল সাধারণ—পেশায় মুদি ব্যবসা। কিন্তু হিমু ভারতের নেপোলিয়ন হয়ে ওঠেন তার অসাধারণ প্রশাসনিক দক্ষতা, কৌশলী বুদ্ধি আর একের পর এক যুদ্ধজয়ের মাধ্যমে।
ইতিহাসবিদদের মতে, তিনি জীবনে প্রায় ২২টি যুদ্ধে জয়ী হয়েছিলেন। এই ধারাবাহিক সাফল্যই তাকে “মধ্যযুগের নেপোলিয়ন” উপাধি এনে দেয়।
সাধারণ জীবন থেকে ক্ষমতার শিখরে: হিমু ভারতের নেপোলিয়ন
শের শাহ সুরির প্রশাসনে কাজ করার সময় থেকেই হিমুর প্রতিভা নজরে আসে। পরে ইসলাম শাহ এবং আদিল শাহের আমলে তিনি আরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান।
প্রশাসক হিসেবে হিমু
গোয়েন্দা বিভাগ পরিচালনা
ডাক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন
রাজস্ব ও সামরিক সিদ্ধান্তে সরাসরি অংশগ্রহণ
এই সময়েই হিমু ভারতের নেপোলিয়ন হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন ক্ষমতার অলিন্দে।
১৫৫৬ সালে দিল্লিতে মুঘল শাসন দুর্বল হয়ে পড়লে, আদিল শাহ হিমুকে দায়িত্ব দেন উত্তর ভারতে মুঘলদের উৎখাত করতে। হিমু বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে দিল্লি অভিযান করেন এবং সফল হন।
দিল্লি দখলের পর—
তিনি “বিক্রমাদিত্য” উপাধি গ্রহণ করেন
নিজের নামে মুদ্রা চালু করেন
হিন্দু রাজ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন
এই সময়েই হিমু ভারতের নেপোলিয়ন ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন।
পানিপথের পথে অগ্রযাত্রা: আত্মবিশ্বাস বনাম সতর্কতা
দিল্লি দখলের পর হিমু জানতেন, মুঘলরা চুপ করে বসে থাকবে না। অন্যদিকে, কিশোর বয়সের সম্রাট আকবর তখন অভিভাবক বৈরাম খাঁ–এর নেতৃত্বে পাল্টা আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
হিমু সিদ্ধান্ত নেন, যুদ্ধ হবে পানিপথ–এ।
পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ ও হিমু ভারতের নেপোলিয়ন
যুদ্ধের শুরু
পানিপথের ময়দানে হিমুর বাহিনী ছিল সংখ্যায় বেশি, অভিজ্ঞতায় এগিয়ে। হাতির পিঠে বসে, কোনো বর্ম ছাড়াই যুদ্ধ পরিচালনা করছিলেন হিমু ভারতের নেপোলিয়ন—সাহসী, কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত।
একটি তীর, একটি মুহূর্ত
যুদ্ধ যখন হিমুর দিকেই ঝুঁকছে, ঠিক তখনই— একটি তীর এসে তার চোখে লাগে। এই আঘাতে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন।
সেনাপতি আহত—এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই তার সেনাবাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়ে।
হিমু ভারতের নেপোলিয়নের পরাজয়ের আসল কারণ
অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, এই পরাজয় ছিল ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। তবে বাস্তব কারণগুলো ছিল—
১. বর্ম না পরা
হিমু ইচ্ছাকৃতভাবে বর্ম পরেননি, যাতে সৈন্যরা তাকে দেখতে পায়। কিন্তু এই সিদ্ধান্তই প্রাণঘাতী হয়।
২. অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস
একাধিক যুদ্ধে জয় হিমুকে কিছুটা আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছিল।
৩. নেতৃত্ব শূন্যতা
হিমু আহত হওয়ার পর সেনাবাহিনীর মধ্যে নেতৃত্বের সংকট তৈরি হয়।
হিমু ভারতের নেপোলিয়নের মৃত্যু
আহত অবস্থায় হিমুকে ধরে আনা হয় আকবরের সামনে। কিছু ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, আকবর নিজে দ্বিধায় ছিলেন। শেষ পর্যন্ত বৈরাম খাঁর নির্দেশেই হিমুর শিরোচ্ছেদ করা হয়।
এভাবেই শেষ হয় হিমু ভারতের নেপোলিয়ন–এর জীবন।
ইতিহাসে হিমু ভারতের নেপোলিয়নের মূল্যায়ন
আজও বিতর্ক চলেই—
যদি সেই তীর না লাগত?
যদি পানিপথে সেদিন ভাগ্য একটু সহায় হতো?
অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, হিমু বেঁচে থাকলে উত্তর ভারতের ইতিহাস অন্যরকম হতে পারত। একটি সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে দিল্লির সিংহাসনে বসা—এই উত্থানই তাকে আলাদা করে।
উপসংহার
হিমু ভারতের নেপোলিয়ন ছিলেন সাহস, দক্ষতা আর উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতীক। তার পরাজয় শুধু একটি যুদ্ধের হার নয়—এটা ছিল ইতিহাসের মোড় ঘুরে যাওয়ার মুহূর্ত।
একটি ছোট ভুল, একটি তীর—আর ভারতের ইতিহাস নতুন পথে হাঁটতে শুরু করে।
সমুদ্র মন্থন ও কুম্ভ মেলার গল্প ভারতীয় পুরাণে এক অত্যন্ত জনপ্রিয় ও বহুবার বলা কাহিনি। দেবতা ও অসুরদের যৌথ উদ্যোগ, অমৃতের লোভ, আর সেই অমৃতকে ঘিরেই কুম্ভ মেলার ধারণা—সব মিলিয়ে এই গল্প যুগ যুগ ধরে মানুষের বিশ্বাসকে প্রভাবিত করে এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই গল্পে বিশ্বাসের বাইরে যুক্তির জায়গা কোথায়?
সমুদ্র মন্থন ও কুম্ভ মেলার গল্পের মূল কাহিনি
পুরাণ অনুযায়ী, দেবতারা একসময় জানতে পারেন যে সমুদ্রের তলদেশে রয়েছে এক বিশাল খাজানা। সেই খাজানা উদ্ধারের ক্ষমতা তাদের একার নেই। তাই তারা অসুরদের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছায়—যৌথভাবে সমুদ্র মন্থন হবে, আর যা পাওয়া যাবে, তাতে উভয় পক্ষের সমান অধিকার থাকবে।
এই চুক্তির সাক্ষী ছিলেন দেবতাদের গুরু ও অসুরদের গুরু। কাগজে-কলমে সব ঠিকঠাক। কিন্তু বাস্তবে চিত্রটা ছিল আলাদা।
সমুদ্র মন্থন ও অমৃতের লোভ
সমুদ্র মন্থনের সময় অসুররাই বেশি খাটে। ভারী কাজ, কঠিন দায়িত্ব—সবই তাদের কাঁধে পড়ে। কিন্তু ফল পাওয়ার সময় দেবতারা তাদের চিরচেনা ধূর্ততার পরিচয় দেয়। একে একে মূল্যবান বস্তু নিজেদের দখলে নেয়।
সবচেয়ে বড় সংঘাত তৈরি হয় অমৃতকে ঘিরে। কারণ অমৃতের মাহাত্ম্য ছিল ভয়ংকর—এক ফোঁটা খেলেই অমরত্ব।
অমৃত মানে শুধু এক পানীয় নয়, এটি ছিল ক্ষমতার চূড়ান্ত প্রতীক। যে অমর, সে অজেয়। তাই অমৃত নিয়ে টানাটানি হওয়াটা ছিল অবশ্যম্ভাবী।
সমুদ্র মন্থন ও কুম্ভ মেলার গল্পে অমৃত কলশির রহস্য
গল্প অনুযায়ী, দেবতারা কৌশলে অমৃতের কলশি লুকিয়ে ফেলে। সেই কলশি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পবিত্র স্থানে রাখা হয়েছিল—যেখানে আজ কুম্ভ মেলার আয়োজন হয় বলে বিশ্বাস।
এই বিশ্বাস থেকেই ধারণা তৈরি হয়, ঐসব স্থানের জলে অমৃতের প্রভাব রয়ে গেছে।
কুম্ভ মেলায় স্নানের বিশ্বাস কোথা থেকে এলো
লোককথা বলছে—কলশি থেকে অমৃতের কয়েক ফোঁটা জলাশয়ে পড়ে গিয়েছিল। আর সেই জলেই স্নান করলে পাপ ধুয়ে যায়, এমনকি মুক্তি মিলতে পারে।
কিন্তু এখানেই প্রশ্নটা উঠে আসে।
সমুদ্র মন্থন ও কুম্ভ মেলার গল্প: বিশ্বাস বনাম যুক্তি
যে অমৃত কোটি কোটি বছর সমুদ্রের তলায় থেকেও এক ফোঁটা লিক করেনি, তা কি কয়েক ঘণ্টার জন্য কোনো নদীতে রাখলেই লিক করে যাবে?
এই প্রশ্নটাই পুরো সমুদ্র মন্থন ও কুম্ভ মেলার গল্প-কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
পৌরাণিক গল্প কি প্রতীকী, নাকি আক্ষরিক?
অনেক গবেষক মনে করেন, এসব গল্প আক্ষরিক নয়—বরং প্রতীকী। অমৃত হতে পারে জ্ঞান, ক্ষমতা বা রাজনৈতিক আধিপত্যের রূপক।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতীক রূপ নিয়েছে অন্ধ বিশ্বাসে।
ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক বাস্তবতা ও সমুদ্র মন্থনের গল্প
এই গল্পগুলো শুধুই ধর্মীয় নয়, সামাজিকও। এখানে আছে—
ক্ষমতার রাজনীতি
পরিশ্রম বনাম ফল
বুদ্ধি বনাম সরলতা
দেবতা-অসুর দ্বন্দ্ব আসলে মানুষের সমাজেরই প্রতিচ্ছবি।
উপসংহার: সমুদ্র মন্থন ও কুম্ভ মেলার গল্প আমাদের কী শেখায়
সমুদ্র মন্থন ও কুম্ভ মেলার গল্প আমাদের বিশ্বাসের ইতিহাস বোঝায়, কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন করতেও শেখায়। বিশ্বাস আর যুক্তির মধ্যে ভারসাম্য না রাখলে গল্প রূপ নেয় অন্ধতায়।
দেবব্রত বিশ্বাস মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় কে বলেছিলেন “কেন এতদিন রবীন্দ্রসঙ্গীতের চর্চা করেননি”—এই ভেবে মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করছিল মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের। ছোটবেলা থেকেই গানের পরিবেশে বড় হওয়া, কাকা রত্নেশ্বর মুখোপাধ্যায় নিজে বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ। কীর্তন, ঠুমরি, টপ্পা—সবই আয়ত্তে। অথচ কোথায় যেন একটা ফাঁক থেকে গিয়েছিল। সেই ফাঁকটার নাম রবীন্দ্রসঙ্গীত।
আর ঠিক সেই জায়গাতেই এসে পড়ল বিপদ। ইন্টার কলেজিয়েট কম্পিটিশনে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতেই হবে। সময় হাতে নেই। প্রস্তুতি নেই। তখন মনে হচ্ছিল—এ তো মহাবিপদ!
দেবব্রত বিশ্বাস কে ছিলেন
দেবব্রত বিশ্বাস—নামটা শুনলেই রবীন্দ্রসঙ্গীতপ্রেমীদের চোখে অন্যরকম আলো জ্বলে ওঠে। অনেকেই তাঁকে চেনেন ‘জর্জ বিশ্বাস’ নামে। রবীন্দ্রনাথের গানে যাঁর উচ্চারণ, আবেগ আর সংযম এক অনন্য মানদণ্ড তৈরি করেছিল। তিনি ছিলেন এমন একজন শিল্পী, যিনি বিশ্বাস করতেন—রবীন্দ্রসঙ্গীত কেবল গান নয়, এক ধরনের সাধনা। তাই এই ধারার সঙ্গে আপস তাঁর অভিধানে ছিল না।
মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের বিপদ ও রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রয়োজন
মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় ছোটবেলা থেকেই গানের পরিবেশে বড় হয়েছেন। কীর্তন, ঠুমরি, টপ্পা—সবই তাঁর রপ্ত। কিন্তু এক জায়গায় এসে যেন হোঁচট। ইন্টার কলেজিয়েট কম্পিটিশনে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতেই হবে। সময় নেই। প্রস্তুতিও নেই। এই মুহূর্তে রবীন্দ্রসঙ্গীত যেন তাঁর কাছে পাহাড়সম বাধা। এখান থেকেই গল্পের নাটকীয়তা শুরু।
সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ে দেবব্রত বিশ্বাসের সঙ্গে ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ
উপায় বাতলে দিলেন কাকা রত্নেশ্বর মুখোপাধ্যায়—সরাসরি দেবব্রত বিশ্বাসের কাছে যেতে। ভোরবেলা হাজির হওয়া হল সাদার্ন অ্যাভিনিউ-এর বাড়িতে। মশারি টাঙানো ঘর, নিস্তব্ধ পরিবেশ। সব দেখে বোঝা যায়—গৃহস্থালি নয়, সঙ্গীতই এই মানুষের আসল সংসার। এক অচেনা মানুষকে ঘুম থেকে তুলে গান শেখার আবদার—যে কোনো মানুষেরই রাগ হওয়ার কথা।
এক ভোরে দেবব্রত বিশ্বাসের কাছে রবীন্দ্রসঙ্গীত শেখা
রাগ হয়েছিল। কিন্তু তা বেশিক্ষণ টেকেনি। সময়টা তখন অন্যরকম ছিল, মানুষগুলোও তাই। মানবেন্দ্রর কাতর অনুরোধ শুনে দেবব্রত বিশ্বাস রাজি হয়ে গেলেন। শুরু হল ‘ধরা দিয়েছি গো আমি আকাশেরও পাখি’। বারবার থামানো, আবার তোলা, আবার শুধরে দেওয়া। গানের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি টান—সবকিছুর মধ্যেই ছিল কঠোর শুদ্ধতা। অফিস যাওয়ার সময় হলেও শেখানো থামেনি। দায়িত্ব বুঝে বোনকে বলে গিয়েছিলেন—গান ঠিক না হওয়া পর্যন্ত ছাড় নেই।
ইন্টার কলেজিয়েট কম্পিটিশনে রবীন্দ্রসঙ্গীত ও বিচারকদের চমক
বিকেলে কম্পিটিশন। সেখানে গিয়ে মানবেন্দ্রর চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। বিচারকদের আসনে বসে আছেন অনাদি দস্তিদার, শৈলজারঞ্জন মজুমদার—আর সঙ্গে দেবব্রত বিশ্বাস নিজেই। সকালে যাঁর কাছে শিখেছেন, বিকেলে তিনিই বিচারক! গান গাওয়া হল। কোনও মতে উতরে গেল রবীন্দ্রসঙ্গীত। উত্তেজনা, ভয়—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত মুহূর্ত।
দেবব্রত বিশ্বাস কেন নম্বর দেওয়া থেকে বিরত ছিলেন
নৈতিকতার জায়গাটাই এখানে সবচেয়ে উজ্জ্বল। দেবব্রত বিশ্বাস স্পষ্ট বুঝেছিলেন—চেনা মানুষকে বিচার করা উচিত নয়। তাই নম্বর দেওয়া থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলেন। কোনও নাটক নয়, কোনও ঘোষণা নয়—নীরব সিদ্ধান্ত। কিন্তু বাকি বিচারকদের বিচারে মানবেন্দ্রই প্রথম। এখানে দেবব্রত বিশ্বাস শুধু একজন শিল্পী নন, একজন আদর্শ মানুষের প্রতীক হয়ে ওঠেন।
“রবীন্দ্রসঙ্গীত আপনার জন্য নয়”—গুরুবাক্যের গভীর অর্থ
পরে ধন্যবাদ জানাতে গেলে যে কথা তিনি বলেছিলেন, তা কঠিন হলেও নির্মম ছিল না— “রবীন্দ্রসঙ্গীত আপনার জন্য নয়। কথা দিন, এই প্রথম আর শেষ।” এটা অপমান নয়। এটা ছিল শিল্পের প্রতি দায়িত্ববোধ। দেবব্রত বিশ্বাস বুঝেছিলেন—সবাই সবকিছুর জন্য তৈরি হয় না। রবীন্দ্রসঙ্গীতের মতো সূক্ষ্ম ধারায় জোর করে ঢোকা উচিত নয়। এই সততাই তাঁকে আলাদা করে।
দেবব্রত বিশ্বাস ও তখনকার মানুষের মূল্যবোধ
আজকের দিনে এমন ঘটনা প্রায় অকল্পনীয়। ভোরবেলা অচেনা মানুষকে শেখানো, বিচারক হয়ে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া, আর শেষে সত্য কথাটা নির্দ্বিধায় বলে দেওয়া—সব মিলিয়ে এক অন্য সময়ের ছবি। দেবব্রত বিশ্বাস সেই সময়ের প্রতিনিধি, যেখানে শিল্পের আগে অহং আসেনি, আর নীতির সঙ্গে আপস ছিল না।
-: ১ :- বিধবা বিবাহের পক্ষে সই ছিল মাত্র ৯৮৭টি, আর বিপক্ষে সই ছিল ৩৬,৭৬৩টি।
বাকিটা ইতিহাস।
-: ২ :- গ্যালিলিও কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে যেদিন বলেছিলেন, “আমি আবার বলছি, সূর্য স্থির। পৃথিবী সূর্যের চারপাশে ঘোরে। আমাকে শাস্তি দিয়েও, সূর্যের চারপাশে পৃথিবীর প্রদক্ষিণ আপনারা বন্ধ করতে পারবেন না, পৃথিবী আগের মতোই ঘুরবে।” সেদিন ওনার কথায় সবাই হেসেছিলো। বিচার সভায় গ্যালিলিও-র শাস্তি হয়েছিল।
বাকিটা ইতিহাস।
-: ৩ :- সতীদাহ প্রথার মতো জঘন্য এক সামাজিক প্রথার বিরুদ্ধে যেদিন রাজা রামমোহন রায় রুখে দাঁড়িয়েছিলেন, সেদিন সমাজের সংখ্যাগরিষ্ট মানুষ ওনাকে হাস্যাস্পদ করেছিল।
বাকিটা ইতিহাস।
-: ৪ :- সিগনেট থেকে প্রকাশিত বিভূতিভূষণের “পথের পাঁচালী”-র সংক্ষিপ্ত সংস্করণ “আম আঁটির ভেঁপু”-র জন্য ছবি আঁকতে আঁকতেই সত্যজিতের মনে হয়েছিল, তিনি যদি কোনোদিন সিনেমা করেন, তবে এটাই হবে তাঁর প্রথম সিনেমা। সিনেমার শুটিং যখন শুরু হয়, তখন শুধু প্রযোজকরাই নন, তৎকালীন বিখ্যাত পরিচালকরাও তাঁর উপর হেসেছিলেন। অনেকে তো ওনাকে পাগল পর্যন্ত বলেছিলেন।
-: ৫ :- আজ যখন আমরা বলি – লড়াইটা আমাদের জাত নিয়ে নয়, ভাত নিয়ে; বাবরি নিয়ে নয়, চাকরি নিয়ে; অস্ত্র নিয়ে নয়, বস্ত্র নিয়ে; দীক্ষা নিয়ে নয়, শিক্ষা নিয়ে; শ্মশান বা কবরস্থান নিয়ে নয়, বাসস্থান নিয়ে – ওরা হাসে আমাদের উপর।
আমরা যখন বলি – লড়াইটা উগ্র দেশপ্রেম আর মানুষে মানুষে বিভেদ নিয়ে নয়, লড়াইটা খাদ্য বাসস্থান শিক্ষা স্বাস্থ্য নিয়ে; লড়াইটা রোজ সন্ধ্যার ওই টিভি স্টুডিওর টিকি আর দাড়ির জন্য নয়, লড়াইটা স্বাধীনতা গণতন্ত্র আর সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য – ওরা হাসে আমাদের উপর।
আমরা যখন বলি – নারীর পিরিয়ড হওয়া মানে তার শরীর অপবিত্র ঘোষণা করে দিয়ে বিভিন্ন জায়গাতে তার প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দেওয়া নয় – তখনও ওরা হাসে আমাদের উপর।
ওদের হাসতে দিন। শুধু একটা কথাই মনে রেখে দিন – হাজারটা লোকও যদি একটা পুকুরকে সমুদ্র বলে, রাতারাতি পুকুরটা সমুদ্র হয়ে যায় না।
তাই প্রশ্ন এটা নয় যে আমরা পরিসংখ্যানে কত শতাংশ? প্রশ্ন এটাও নয় যে আমরা নগণ্য!
উত্তর একটাই:
আজ থেকে অনেকগুলো বছর পর কারখানার খেটে খাওয়া ওই শ্রমিকগুলো, অথবা স্কুল কলেজে পড়া ওই ছেলে মেয়েগুলো, মাঠের ধারে ওই বেঞ্চটাতে বসে যখন গল্প করবে, ওরা বলবে,
“জানিস, আজ থেকে অনেকগুলো বছর আগে সবাই যখন ধর্মের নেশাতে মানুষকে মাতিয়ে রেখেছিলো, আমাদের মত খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের জন্য ওই ওরাই ঠিক আওয়াজ তুলেছিল”।
পৃথিবীর সব যুদ্ধ জেতা যায় না, কিন্তু লড়াইয়ের ময়দানে থাকতে হয় – এটা বোঝানোর জন্য কেউ তো একজন ছিল, কেউ তো একজন শুরু করেছিল, কেউ তো একজন শাসকের চোখে চোখ রেখে বলতে পেরেছিলো।
জাপানে ভারতীয় পর্যটকের কাণ্ড শুধু একটি ব্যক্তিগত বদভ্যাসের গল্প নয়, বরং এটি দেখিয়ে দেয় উন্নত দেশে শৃঙ্খলা, প্রযুক্তি ও দায়িত্ববোধ কীভাবে একসাথে কাজ করে। একটি ফাইভ স্টার হোটেলের সুইমিংপুলে করা সামান্য অসভ্য আচরণ যে একজন পর্যটকের পুরো ভ্রমণই নয়, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাও শেষ করে দিতে পারে—এই ঘটনাই তার প্রমাণ। একই সঙ্গে প্রশ্ন তোলে, আমরা ব্যক্তি হিসেবে কতটা সচেতন, আর রাষ্ট্র হিসেবে কতটা দায়িত্বশীল?
জাপানের ফাইভ স্টার হোটেলে একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা
এক ভারতীয় পর্যটক জাপানে ঘুরতে গিয়ে একটি ফাইভ স্টার হোটেলে ওঠেন। হোটেলের সুইমিংপুলে তখন আর কোনো অতিথি ছিল না। একা পুলে নামার পরেই তার মাথায় আসে এক চরম বোকামিপূর্ণ চিন্তা। মজার ছলে সুইমিংপুলে মূত্র বিসর্জন দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পরিস্থিতি পাল্টে যায়।
পুলের জলের একটি অংশ হঠাৎ গোলাপি রঙ ধারণ করে এবং অ্যালার্ম বেজে ওঠে। মুহূর্তের মধ্যেই হোটেল স্টাফরা ছুটে আসে। এখান থেকেই জাপানে ভারতীয় পর্যটকের কাণ্ড আর নিছক কাণ্ড থাকে না, এটি রূপ নেয় শাস্তিযোগ্য অপরাধে।
শৃঙ্খলার দেশে অসভ্য আচরণের তাৎক্ষণিক ফল
জাপানে নজরদারি ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে
জাপানের হোটেল ব্যবস্থায় প্রতিটি জায়গায় উন্নত সেন্সর ও মনিটরিং সিস্টেম থাকে। সুইমিংপুলের পানিতে রাসায়নিক পরিবর্তন ধরা পড়তেই অ্যালার্ম সক্রিয় হয়ে যায়। এর মানে হলো—এখানে “লুকিয়ে করা কাণ্ড” বলে কিছু নেই।
এই ঘটনায় হোটেল কর্তৃপক্ষ পুরো পুলের পানি ফেলে দিয়ে নতুন করে পরিষ্কার করার সিদ্ধান্ত নেয়। ক্ষতির দায় সরাসরি পর্যটকের উপর বর্তায়। জাপানে ভারতীয় পর্যটকের কাণ্ড এখানে মজার গল্প না হয়ে দাঁড়ায় বড় ধরনের দায়িত্বহীনতার উদাহরণ।
পাসপোর্টই যখন হয়ে ওঠে অপরাধের পরিচয়
ঘটনার মাত্র দশ মিনিটের মধ্যেই ওই পর্যটককে রিসেপশনে ডেকে আনা হয়। তার হাতে পাসপোর্ট ধরিয়ে দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হয়—এই হোটেলে তার থাকা আর সম্ভব নয়। এখানেই শেষ নয়।
হোটেল নেটওয়ার্ক ও কালো তালিকা ব্যবস্থা
পরবর্তীতে সে একের পর এক হোটেলে থাকার চেষ্টা করে—ফাইভ স্টার, ফোর স্টার, এমনকি থ্রি স্টার হোটেলেও। প্রতিবারই রিসেপশনিস্ট তার পাসপোর্ট দেখে চিনে ফেলে। প্রতিক্রিয়া একই—ভদ্র কিন্তু দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান।
এখানে বোঝা যায়, জাপানে ভারতীয় পর্যটকের কাণ্ড শুধু একটি হোটেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। হোটেলগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে তার পরিচয় ছড়িয়ে পড়েছে পুরো সিস্টেমে।
সারাদিন ঘুরে কোথাও আশ্রয় না পেয়ে শেষমেশ পর্যটক নিজের দেশের এমব্যাসিতে যায়। সেখান থেকে তাকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়—যেসব হোটেলে সুইমিংপুল আছে, সেখানে সে ভবিষ্যতেও থাকতে পারবে না। তার পাসপোর্টে এই ঘটনার রেকর্ড থেকে গেছে।
জাপান ত্যাগ করার সময় বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন অফিসার পাসপোর্টে সিল মারতে মারতে যে মন্তব্যটি করে, সেটাই এই ঘটনার সারকথা—শিক্ষা না নিলে ভ্রমণের অধিকার মূল্যহীন।
এই পর্যায়ে এসে জাপানে ভারতীয় পর্যটকের কাণ্ড সম্পূর্ণভাবে এক সতর্কবার্তায় পরিণত হয়।
ব্যক্তিগত কাণ্ড কীভাবে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করে
একজন পর্যটক যখন বিদেশে যায়, সে একা নিজের পরিচয় বহন করে না। তার সঙ্গে থাকে তার দেশের নাম, সংস্কৃতি ও নাগরিক চরিত্র। একটি ছোট অসভ্য আচরণ পুরো জাতিকে নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে।
এই ঘটনা প্রমাণ করে, জাপানে ভারতীয় পর্যটকের কাণ্ড আসলে একটি দেশের নাগরিক শিষ্টাচার নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দেয়। বিদেশে আইন মানা ঐচ্ছিক নয়—এটা বাধ্যতামূলক।
উন্নত দেশের শৃঙ্খলা বনাম আমাদের বাস্তবতা
একদিকে জাপানে একটি সুইমিংপুল নোংরা হওয়ায় পুরো সিস্টেম নড়ে ওঠে। অন্যদিকে আমাদের দেশে রাষ্ট্রের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার লোপাট হয়ে গেলেও দোষী চিহ্নিত করা যায় না। এই তুলনা অস্বস্তিকর হলেও বাস্তব।
এই জায়গায় এসে জাপানে ভারতীয় পর্যটকের কাণ্ড শুধু ভ্রমণ কাহিনি থাকে না, এটি রাষ্ট্রব্যবস্থার পার্থক্য চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
এই ঘটনা আমাদের কী শিক্ষা দেয়
বিদেশ ভ্রমণে আচরণ কেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
বিদেশে গিয়ে আইন ভাঙলে “আমি ট্যুরিস্ট” যুক্তি কোনো কাজ করে না। শৃঙ্খলাপূর্ণ সমাজে ব্যক্তিগত দায়িত্বই শেষ কথা। একটু মজা করার মানসিকতা যে কত বড় অপমান ডেকে আনতে পারে, এই ঘটনাই তার প্রমাণ।
শেষ পর্যন্ত ফেসবুকে লেখা সেই লাইন—“পুরো জাপান জেনে গিয়েছিলো”—আসলে আত্মস্বীকারোক্তি। জাপানে ভারতীয় পর্যটকের কাণ্ড আমাদের শেখায়, সভ্যতা দেখানোর বিষয় নয়, চর্চার বিষয়।
ধর্মহীন সমাজ ও অপরাধ প্রবণতা: সত্যিই কি ধর্ম ছাড়া সমাজ ভেঙে পড়ে?
ধর্মহীন সমাজ ও অপরাধ প্রবণতা—এই দুটো বিষয় নিয়ে আমাদের দেশে এক ধরনের ভয় কাজ করে। ছোটবেলা থেকেই আমাদের শেখানো হয়, ধর্ম না থাকলে মানুষ নৈতিকতা হারায়, সমাজ উচ্ছন্নে যায়। কিন্তু বাস্তব পৃথিবীর কিছু দেশের অভিজ্ঞতা সেই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। বিশেষ করে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো দেখাচ্ছে, ধর্ম ছাড়াও সমাজ শৃঙ্খলিত, মানবিক ও নিরাপদ হতে পারে।
ধর্মহীন সমাজ ও অপরাধ প্রবণতা: স্ক্যান্ডিনেভিয়ান অভিজ্ঞতা
সুইডেন ও ডেনমার্কের মতো দেশগুলোতে ঈশ্বরে বিশ্বাসের হার অত্যন্ত কম। সুইডেনে প্রায় ৮৫% এবং ডেনমার্কে প্রায় ৮০% মানুষ নিজেদের ধর্মহীন বা নাস্তিক বলে পরিচয় দেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই দেশগুলোই পৃথিবীর সবচেয়ে কম অপরাধপ্রবণ ও কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় উপরের দিকে থাকে।
সুইডেনের কারাগারগুলোতে বন্দির সংখ্যা ক্রমাগত কমছে। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে সরকারকে কিছু কারাগার বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। যদি ধর্মহীনতা সমাজ ধ্বংস করত, তাহলে এই চিত্র কি সম্ভব হতো?
ধর্ম বনাম নৈতিকতা: কোনটা আসলে সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করে?
আমাদের মতো ধর্মবিশ্বাসী দেশগুলোতে ঈশ্বর, আল্লাহ বা ভগবানের ভয়কে নৈতিকতার মূল ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, শুধুমাত্র ধর্মীয় বিশ্বাস অপরাধ বা দুর্নীতি কমাতে পারে না।
ধার্মিক দেশ ও দুর্নীতির বাস্তব চিত্র
ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তানের মতো গভীরভাবে ধর্মবিশ্বাসী দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরেই দুর্নীতির তালিকায় শীর্ষে বা কাছাকাছি অবস্থান করছে। এখানেই প্রশ্ন ওঠে—ধর্ম যদি অপরাধ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হতো, তাহলে এই দেশগুলোর পরিস্থিতি ভিন্ন হতো না কেন?
Society without God: গবেষণা কী বলছে?
২০০৫–২০০৬ সালে সমাজবিজ্ঞানী ফিল জুকারম্যান পূর্ব ইউরোপ ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলোতে গবেষণা চালান। তাঁর গবেষণা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে লেখা বই Society without God-এ উঠে আসে এক চমকপ্রদ বাস্তবতা।
ডেনমার্কের আরহাস শহরের অভিজ্ঞতা
ডেনমার্কের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর আরহাসে প্রায় এক মাস থাকার সময় তিনি হাতে গোনা কয়েকবার পুলিশের গাড়ি দেখেছিলেন। ২৫ লক্ষাধিক মানুষের শহরে পুরো এক বছরে মাত্র একটি খুনের ঘটনা রিপোর্ট হয়েছিল। এই তথ্য ধর্মহীন সমাজ ও অপরাধ প্রবণতা বিষয়ে প্রচলিত ধারণাকে ভেঙে দেয়।
ধর্মহীন সমাজ ও অপরাধ প্রবণতা: সুখ সূচকের সঙ্গে সম্পর্ক
৯১টি দেশের ওপর করা এক জরিপে দেখা গেছে, ডেনমার্ক বিশ্বের সবচেয়ে সুখী দেশগুলোর একটি। সেখানে মানুষ পাপ, পরকাল, বেহেশত বা দোজখের ধারণায় বিশ্বাস না করেও সুখে ও শান্তিতে বসবাস করছে।
কেন তারা বেশি সুখী?
উচ্চ গড় আয়ু
উন্নত স্বাস্থ্যসেবা
শিক্ষার উচ্চ হার
লিঙ্গসমতা
সামাজিক নিরাপত্তা
পরিবেশ সচেতনতা
এই সবকিছু মিলিয়েই ধর্ম ছাড়াও একটি সুস্থ সমাজ গড়ে উঠেছে।
ধর্ম ছাড়াও নৈতিক সমাজ কি সম্ভব?
স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর মানুষ মনে করে, ভালো মানুষ হতে ঈশ্বরভীতি অপরিহার্য নয়। তারা যুক্তিবাদ, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেয়।
যুক্তি ও বাস্তবতার ওপর ভরসা
এই দেশগুলোতে সমস্যা আছে, তবে সমাধান খোঁজা হয় বাস্তব ও যৌক্তিক পথে। তারা কাল্পনিক শক্তির ওপর নির্ভর না করে সামাজিক কাঠামো ও নীতিনির্ধারণের মাধ্যমে সমস্যা মোকাবিলা করে।
অপরাধী কারা: গবেষণার চমকপ্রদ তথ্য
ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি ১৯৮৮ সালে ভারতের জেলখানায় এক সমীক্ষা চালায়। ফলাফল ছিল চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোর মতো—জেলবন্দিদের শতভাগই কোনো না কোনো ধর্মে বিশ্বাসী।
আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান কী বলছে?
আমেরিকায় করা এক সমীক্ষায় দেখা যায়, জেল হাজতে নাস্তিকের সংখ্যা মাত্র ০.২%। অর্থাৎ ঈশ্বরভীতি বা পরকালের ভয় অপরাধীদের অপরাধ থেকে নিবৃত্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে।
ধর্মহীন সমাজ ও অপরাধ প্রবণতা: আসল শিক্ষা কী?
এই আলোচনার উদ্দেশ্য ধর্মকে আক্রমণ করা নয়। বরং প্রশ্ন তোলা—নৈতিকতা, মানবিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ কি শুধুই ধর্মনির্ভর?
শেষ কথা
ধর্মহীন সমাজ ও অপরাধ প্রবণতা নিয়ে ভয় দেখানো ধারণা বাস্তব তথ্যের সঙ্গে মেলে না। সুইডেন ও ডেনমার্ক প্রমাণ করেছে, ধর্ম ছাড়াও একটি সমাজ শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক ও সুখী হতে পারে। আসল শক্তি আসে শিক্ষা, যুক্তিবাদ ও মানবিক মূল্যবোধ থেকে—ধর্ম থাকুক বা না থাকুক।
দল নেই তো বল নেই—এই কথাটা শুধু প্রবাদ নয়, মানুষের জীবন আর টিকে থাকার সবচেয়ে বড় সত্য। মানুষ একা বাঁচার জন্য তৈরি হয়নি। শক্তি, সাহস বা বুদ্ধি—সব কিছুর আসল মানে তৈরি হয় তখনই, যখন তার পাশে থাকে আরেকজন মানুষ। ইতিহাস বলে, বিবর্তনও তাই শেখায়—যে মানুষ দল বেঁধে থাকতে পেরেছে, সেই মানুষই টিকে গেছে। আর যে একা হয়ে পড়েছে, সে ধীরে ধীরে দুর্বল হয়েছে—মনে, শরীরে, সমাজে। আজকের আধুনিক জীবনে দাঁড়িয়ে আমরা এই সত্যটাই সবচেয়ে বেশি ভুলে যাচ্ছি।
“একসময় মানুষের ৬টি প্রজাতি ছিল, যার পাঁচটি পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। থেকে গেছে মাত্র একটি প্রজাতি – হোমো স্যাপিয়ান্স। কেন হোমো স্যাপিয়ান্স প্রজাতিটি টিকে গেলো আর অনেক বড়ো আকৃতির এবং অনেক বেশি শক্তিশালী “নিয়ান্ডারথাল” নামক মানুষের প্রজাতিটি বিলুপ্ত হয়ে গেলো? তার কারণ খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা বলছেন – তার প্রধান একটি কারণ হচ্ছে নিয়ান্ডারথাল মানুষ ছিল মূলত “সলিটারি” – মানে তারা একা একা বাঁচতে পছন্দ করতো। অন্যদিকে হোমো স্যাপিয়ান্স প্রজাতিটি সব সময় দল বেঁধে থাকতো। জীব জগতে এটি নতুন কিছু নয়। একদিকে লেপার্ড যেমন সলিটারি আনিম্যাল, অন্যদিকে সিংহ, হায়েনারা থাকে দল বেঁধে। দল বেঁধে থাকার সুবিধে হলো – সেফটি ইন নাম্বারস। মানে একজন বিপদে পড়লে বাকিরা তাকে সাহায্য করতে পারে। সলিটারি আনিম্যালদের ক্ষেত্রে তেমনটা ঘটে না। ঠিক এই কারণেই হোমো স্যাপিয়ান্সরা একসময় দল বেঁধে মেরে শেষ করেছিল অনেক বেশি শক্তিশালী কিন্তু সলিটারি নিয়ান্ডারথাল প্রজাতিকে। নিয়ান্ডারথালরা সলিটারি প্রাণী হওয়ায় তারা তেমন প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি। তাছাড়া দল বেঁধে থাকায় স্যাপিয়ান্স প্রজাতিটির খাদ্যের অভাব হয়নি এবং মহিলা, শিশু ও অসুস্থরা প্রয়োজনীয় প্রোটেকশন পেয়েছে।
কিন্তু ঘোর নগরকেন্দ্রিক জীবনে এসে আমরা ক্রমশ ভুলে যাচ্ছি যে হোমো স্যাপিয়ান্স প্রজাতিটি সংঘবন্ধ জীব। নেচারে আমরা যে এখনো বিলুপ্ত হইনি তার কারণ আমরা দল বেঁধে ছিলাম। একা বাঁচার জন্য আমাদের তৈরী করা হয়নি। কাজেই মানুষ কোনো কারণে একা হয়ে গেলে, নেচার শারীরবৃত্তীয়ভাবে মানুষকে ফাইটিং মোডে নিয়ে যায়। একাকিত্বে ভোগা মানুষের উপর স্টাডি করে দেখা গেছে যে তাদের প্রেসার বেশি, সুগার লেভেল বেশি এবং হার্টবিটও বেশি। মানুষ তখন অপরিচিতদের থ্রেট হিসেবে দেখতে শুরু করে। তার থেকে একটি ভিসিয়াস সাইকেল তৈরী হয়। মানুষের ইমিউনিটি কমে যায়, ইনফ্লামেশন বেড়ে যায়, হার্ট ডিসিস, স্ট্রোক এবং প্রিম্যাচিওর ডেথের চান্স বেড়ে যায় প্রায় ৫৮% ! স্টাডি বলছে, বর্তমান পৃথিবীতে ৩৩% মানুষ একাকিত্বে ভোগেন – মানে প্রত্যেক তিনজনের একজন। তারা কিন্তু সবাই বয়স্ক নন। সবচেয়ে বেশি একাকী মানুষ থাকেন ব্রাজিলে, তারপর তুরস্ক এবং তৃতীয় স্থানে রয়েছে ভারত ! ডিমেনশিয়া, আলজাইমার, ডিপ্রেশন ভারতে যে প্রায় মহামারীর আকার ধারণ করেছে তার অন্যতম কারণ এই একাকিত্ব। সাইকোলজিস্টরা বলছেন একাকিত্ব মানে কিন্তু একা থাকা নয়। একাকিত্ব একটি “স্টেট অফ মাইন্ড” যেখানে মানুষটির মনে হচ্ছে সে একা, নির্বান্ধব, মন খুলে দুটি কথা বলার যার কেউ নেই। তাহলে উপায় ? এই নিয়ে একটি সেমিনার অ্যাটেন্ড করলাম সেখানে ভারত-আমেরিকা -ইংল্যান্ডের নামকরা ডাক্তারবাবুরা নিদান দিলেন আরো বেশি বেশি “সোশ্যাল ইন্টারঅ্যাকশন এবং সোশ্যাল কানেক্ট” তৈরী করার। তারা বললেন হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের খুঁজে বের করে তাদের সঙ্গে দেখা করার। সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে বন্ধু সার্কেলকে বাড়ানো এবং রিয়েল ওয়ার্ল্ডে তাদের সঙ্গে বেশি বেশি সোশালাইজ করার। কে জানতো, ছেলে-বুড়োদের সকাল-সন্ধেতে চায়ের দোকানের আড্ডা বা পাড়ার কাকিমা-জ্যেঠিমাদের “পাড়া বেড়ানো” বস্তুটিই আসলে সুস্থ থাকার চাবিকাঠি ! এই সেমিনারে এক বয়স্ক ভদ্রলোক নিজের জীবনের কথা বললেন। স্ত্রী মারা যাবার পর তিনি নিদারুন একাকিত্বে ভোগেন এবং ২০১৯ তে তার স্টেজ ওয়ান ক্যান্সার ধরা পড়ে। ভদ্রলোক তখন “আর ক’দিনই বা বাঁচবো, যাবার আগে সবার সঙ্গে দেখা করে যাই” মোডে চলে গিয়ে খুঁজে খুঁজে তার হারিয়ে যাওয়া আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং নিজের বাড়িতে তাদের ডেকে নিয়ে সকাল-সন্ধে আড্ডা বসান। ভদ্রলোক যে শুধু ক্যান্সার সারভাইভ করেছেন তাই নয়, তিনি বললেন আমি এখন মানসিক ভাবে সম্পূর্নই সুস্থ। মজা করে আরো বললেন, বাড়িতে আড্ডা বসানোয় চা, সিঙ্গাড়া, মিষ্টি দিয়ে আতিথেয়তায় তার যে খরচ হয় সেটি ওষুধের খরচের ৩০%-ও নয়*। ওটাকে তিনি ভালো থাকার ইনভেস্টমেন্ট হিসেবেই দেখেন !
রবি ঠাকুর সেই কবেই লিখে গেছেন “আরেকটিবার আয় রে সখা, প্রাণের মাঝে আয় / মোরা সুখের-দুখের কথা কব, প্রাণ জুড়াবে তায়” – ডিপ্রেশন ও নানাবিধ সাইকোলজিক্যাল রোগ থেকে বাঁচতে সোশ্যাল ইন্টারঅ্যাকশনের মাধ্যমে এই “প্রাণ জুড়োনোর” কোনো বিকল্প কিন্তু ডাক্তারবাবুরাও দিতে পারছেন না কেননা নেচার, হোমো স্যাপিয়ান্স প্রজাতিকে সেভাবে বানায়নি।”……
তাই আসুন ব্যবসাটা নিয়ে আরও উঠে পড়ে লাগি। রোজ নতুন নতুন মানুষের সঙ্গে মিশি। ইউনিটি না থাকলে ইমিউনিটিও কমে যায়। চলুন দল বেঁধে আনন্দ করতে করতে জীবনটাকে এঞ্জয় করি আর সকলের স্বপ্ন পূরণ করি। আজ থেকেই শুরু হয়ে যাক। মনে রাখবেন, হোমো স্যাপিয়েন্স হল মানুষের শেষ প্রজাতি। এদের, মানে আমাদের বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব কিন্তু আমাদেরই। সুতরাং যদি-