145dba
Author

বাংলা ডিজিটাল

Browsing

ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক গল্প অনেক সময় এমন সত্য তুলে ধরে, যা বড় বড় তর্ক-বিতর্কেও উঠে আসে না। একটি সাধারণ কর্পোরেট ইন্টারভিউয়ের মধ্য দিয়ে কীভাবে আজকের সমাজ, রাজনীতি, মিডিয়া এবং ডিজিটাল আসক্তির পুরো ছবি ফুটে ওঠে—এই গল্প ঠিক সেটাই দেখায়।

একটি কর্পোরেট ইন্টারভিউ থেকে শুরু

ছ’টা নাগাদ লাস্ট ক্যান্ডিডেট হিসেবে ঘরে ঢুকল একটি মেয়ে। নাম শ্রীলেখা। বয়স আটাশ। ইংলিশে এমএ। হেড অফিসের কর্পোরেট কমিউনিকেশন পোস্টের জন্য ইন্টারভিউ দিতে এসেছে। পোশাক-আশাক একেবারেই সাধারণ।

অ্যাপিয়ারেন্সের দিক দিয়ে বাকিদের তুলনায় পিছিয়ে থাকলেও, কথাবার্তায় সে ভয়ংকর রকম শার্প। কয়েকটা প্রশ্ন যেভাবে উত্তর দিল, তাতেই বোঝা গেল—সলিড ক্যান্ডিডেট। অযথা কথা নেই। যা বলছে, মেপে বলছে। টু দ্য পয়েন্ট। আত্মবিশ্বাসে ভরপুর।

বোর্ডের বাকি সদস্যরা প্রশ্ন করছে। আমি চুপচাপ বসে শুধু ওর উত্তর শুনছি। মনে মনে ঠিক করে ফেলেছি—একে আলাদা করে আর কিছু জিজ্ঞেস করার দরকার নেই। সারাদিনের মধ্যে এই মেয়েটাই বেস্ট ক্যান্ডিডেট।

এক অপ্রত্যাশিত প্রশ্ন: মুখ্যমন্ত্রী হলে কী করবেন?

সবাই যখন প্রশ্ন শেষ করল, তখন আমার পালা। হঠাৎ মাথায় একটা দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেল। ইংরেজি বাদ দিয়ে পরিষ্কার বাংলায় জিজ্ঞেস করলাম—

— ধরুন আপনি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। শিল্প নিয়ে আপনার কী বক্তব্য?

হঠাৎ এমন প্রশ্নে শ্রীলেখা একটু চমকে গেল। তারপর নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে ধীরস্থির গলায় বলা শুরু করল। জমি অধিগ্রহণ, ক্ষতিপূরণ, আন্দোলন, অপজিশনের সুযোগ নেওয়ার কথা উঠে এলো একে একে।

তার মতে, এই রাজ্যে শিল্প বিষয়টা অনেকটা মগডালে বসা ব্রহ্মদৈত্যের মতো—আছে কি নেই বোঝা দায়। তাই অযথা বিতর্কে না গিয়ে “যা চলছে তাই চলুক” নীতি। বছরে একটা করে শিল্প সম্মেলন, চেম্বার অফ কমার্সের সঙ্গে ঘটা করে মিটিং—ব্যস, বাকিটা উড়ো খই।

স্কুলের ইভেন্ট কালচার কি শিশুদের সংবেদনশীল মনে আঘাত করছে?

ডিজিটাল ডেটা আর ইয়ং জেনারেশনের ফাঁদ

এরপর প্রশ্ন এল ইয়ং জেনারেশন নিয়ে।

শ্রীলেখার উত্তর শুনে ঘর খানিকটা স্তব্ধ হয়ে গেল। তার মতে, পাবলিক এখন খুব বেশি কিছু চায় না। মাস গেলে হাতে কিছু টাকা, পকেটে স্মার্টফোন, সস্তায় ডেটা, মল-টলে একটু ঘোরাঘুরি আর বছরে এক-দুবার দিঘা, পুরি বা দার্জিলিং—এই হল সুখ।

আসল চাহিদা একটাই—ডেটা। মোবাইলে বুঁদ হয়ে থাকতে পারলেই সব ঠিক। রিয়েল লাইফে যা করা যায়নি, সোশ্যাল মিডিয়ার কল্পনার দুনিয়ায় সেগুলো করা যাবে। ফেসবুকের হাততালিতে ফ্রাস্ট্রেশন গলে যাবে।

শ্রীলেখা অকপটে বলল—নিজের চোখের সামনে দেখেছে এমন মানুষ, যে মাসে হাজার টাকাও রোজগার করতে পারে না, সে-ই বুড়ো বাবার পেনশনে বসে ফেসবুকে “Do it now” বলে বাতলিং ঝাড়ছে। এমন লোক যত থাকবে, রাজ্য চালানো তত সহজ।

ডিজিটাল গভর্নেন্স মানে হবে—ফেসবুক পালের গোদা। সঙ্গে থাকবে ইউটিউব, নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন প্রাইম, হটস্টার। অনলাইন গেম, অনলাইন জুয়া, টিকটক ভিডিওতে আট থেকে আশি সবাই নেচে নিজেদের প্রদর্শন করবে।

ডেটার চৌবাচ্চা বানিয়ে এমন ব্যবস্থা করা হবে, যাতে ইন্টারনেটের বাইরেও একটা পৃথিবী আছে—সেটাই মানুষ ভুলে যায়।

মিডিয়া ম্যানেজমেন্টের নগ্ন বাস্তবতা

মিডিয়া নিয়ে প্রশ্নে শ্রীলেখার উত্তর আরও সোজাসাপ্টা।

সরকারি বিজ্ঞাপনে মিডিয়াকে এমনভাবে বেঁধে ফেলা হবে, যাতে তাদের আয়ের বড় অংশই আসে সরকারের কাছ থেকে। সরকারি পয়সাতেই যখন বেতন, তখন নিরপেক্ষতার গল্প আপনা থেকেই উধাও হয়ে যাবে।

ডেমোক্রেসির ফোর্থ পিলারের গল্প কাগজে-কলমে থাকবে। বাস্তবে সবাই সুর মিলিয়ে গান গাইবে।

ডেমোক্রেসির ফোর্থ পিলারের গল্প কাগজে-কলমে থাকবে। বাস্তবে সবাই সুর মিলিয়ে গান গাইবে।

হাসির আড়ালে যে কঠিন প্রশ্ন থেকে যায়

এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে শ্রীলেখা থামল। ঘর ভরে উঠল অট্টহাসিতে। মনে হচ্ছিল, কোনো কর্পোরেট চাকরিপ্রার্থী নয়—একজন পরিণত রাজনীতিবিদ কথা বলছে।

ইন্টারভিউ শেষ। বাড়ি ফেরার পথে মিষ্টির দোকানে ঢুকলাম। আপন মনে হাসছি। পাঁচ মিনিটে যেভাবে একটা মেয়ে আজকের সমাজের পুরো এক্স-রে করে দিল, সেটা টিভির ঘণ্টার পর ঘণ্টা চেঁচামেচির থেকেও বেশি সত্যি।

এই ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক গল্প মুখে হাসি ফোটালেও, ভিতরে ভিতরে একটা অস্বস্তিকর প্রশ্ন রেখে যায়—
আমরা কি সত্যিই এমন সমাজই চাই?

আজকাল বাচ্চাদের স্কুল মানেই দামী স্কুল, আর সারা বছর জুড়ে নানান ধরনের অনুষ্ঠান। এসবের খবর আমরা পাই বিভিন্ন মায়েদের গ্রুপের পোস্ট থেকে, আবার অনেক সময় পেশেন্টদের কথাতেও শুনি।
এই সব কার্যকলাপ বা activity-র উদ্দেশ্য বলা হয়—খেলার ছলে বাচ্চাদের শেখানো।

কিন্তু বাস্তবে এই স্কুলের ইভেন্ট কালচার বাবা-মায়ের উপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
প্রায় প্রতিটি ইভেন্টের জন্য কিছু না কিছু প্রস্তুত করতে হয়—জামাকাপড়, খাবার, সাজসজ্জা। সময় আর টাকার দুটোই দরকার।

ধরুন, স্কুলের ইভেন্ট কালচার “Yellow Day”। বাচ্চাদের হলুদ জামা পরে যেতে হবে, হলুদ রঙ চিনবে।
আবার কখনো “Mango Day”, কখনো মা দিবস, বাবা দিবস। এইসব অনুষ্ঠানে বাবা-মাকেও স্কুলে যেতে বলা হয়।

ভালো দিক অবশ্যই আছে। ছোট বাচ্চারা এতে খেলতে খেলতে কিছু শেখে।
কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন উপলক্ষটাই লক্ষ্য থেকে বড় হয়ে যায়।

বাচ্চাদের মন খুবই সংবেদনশীল।
একজন মা একদিন মেয়েদের গ্রুপে লিখেছিলেন—তার বাচ্চার স্কুলে “Mango Day” ছিল।
তিনি ভুলে গিয়েছিলেন আম দিয়ে টিফিন পাঠাতে।

ফলাফল?
সেদিন দিদিমণি বাচ্চাটিকে টিফিন খেতে দেননি।

এই ঘটনায় বাচ্চাটি শুধু ক্ষিদেয় কষ্ট পায়নি, অপমানিতও হয়েছে।
হয়তো তার মনে হয়েছে—মা কি তাহলে তাকে যথেষ্ট ভালোবাসেন না?

অথচ বাস্তবটা ঠিক উল্টো।
বাবা-মা ব্যস্ত বলেই তো এমন স্কুলে বাচ্চাকে পড়াতে পাঠান।

শতাব্দী দাস সম্প্রতি মা দিবস ও বাবা দিবস নিয়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা বলেছেন।
এই ধরনের অনুষ্ঠান বড় করে পালন করলে single parent পরিবারের বাচ্চাদের মনে গভীর আঘাত লাগে।

মাসি, পিসি, ভাই-বোন পাতানো যায়।
কিন্তু মা বা বাবা—তাদের জায়গা কেউ নিতে পারে না।

আর একটা সত্য কথা হলো—এই স্কুলের ইভেন্ট কালচার পুরোপুরি শিক্ষার জন্য নয়।
এর সঙ্গে অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যও জড়িয়ে আছে।

অনেক স্কুলেই এইসব অনুষ্ঠানের জন্য বাবা-মাকে আলাদা করে জিনিসপত্র কিনতে হয়।
সব পরিবার যে সেই খরচ বহন করতে পারে, তা নয়।

এই সব ভাবতে ভাবতেই নিজের স্কুলের কথা মনে পড়ে যায়।
সরকারি স্কুল।
তখন সরকারি স্কুল মানেই ছিল আলাদা সম্মান।

আমাদের দিদিমণিরা সব সময় একটা কথা মাথায় রাখতেন—
এই স্কুলে সব রকম আর্থিক ও সামাজিক স্তরের বাচ্চারা পড়ে।

কোনো হাতের কাজের জিনিস আনতে বললেও পরিষ্কার করে বলা হতো—
“বাবা-মা না পারলে চাপ দেবে না।”

আর দামী জিনিস স্কুলে আনা একেবারেই নিষেধ ছিল।
কারণ, একজনের দামী জিনিস আরেকজনের মনে কষ্ট দিতে পারে।

স্কুলে ঢুকলে সবাই সমান—এই শিক্ষাটাই ছিল সবচেয়ে বড়।
এই কথাগুলো একদিনে শেখানো হয়নি।
বারবার বলা হয়েছে। তাই মনে গেঁথে গেছে।

আমি দাবি করছি না যে সরকারি স্কুলে কখনো অমানবিক আচরণ হয়নি।
আমি শুধু আমার স্কুলের সেই বিশেষ শিক্ষার কথাই বলছি।

মানুষের অনুভূতিতে আঘাত না দেওয়া।
কারো দুর্বলতার সামনে নিজের বিত্ত প্রদর্শন না করা।
বাবা-মায়ের সীমাবদ্ধতা বোঝা।

আজকের স্কুলের ইভেন্ট কালচার কি এই মানবিক শিক্ষা দিচ্ছে?
নাকি শিশুদের বোঝাচ্ছে—খুশি থাকতে হলে বেশি বেশি জিনিস দরকার?

Yellow Day-তে হলুদ জামা না থাকলে লজ্জা।
Mango Day-তে আম না আনলে অপমান।
জন্মদিনে উপহার না আনলে ছোট হয়ে যাওয়া।

এর চেয়ে অনেক বেশি জরুরি হলো—
শিশুকে মানবিক অনুভূতি শেখানো।

লেখক – অরুণিমা ঘোষ

জীবনের পথে আমরা সবাই কোনো না কোনো সময় কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে পড়ি। এই বাংলা ছোট গল্পটি ঠিক তেমনই এক মুহূর্তের কথা বলে, যেখানে একটি ছোট সিদ্ধান্ত একজন মানুষের পুরো জীবন বদলে দেয়।

রাহুল ছিল খুব সাধারণ একজন মানুষ। প্রতিদিন একই রুটিন, একই কাজ। কিন্তু একদিন হঠাৎ করেই তার সামনে আসে দুটি পথ। একদিকে নিরাপদ জীবন, অন্যদিকে অজানা ভবিষ্যৎ।

সিদ্ধান্তের মুহূর্ত

সেই রাতে রাহুল ঘুমোতে পারেনি। মাথার ভেতর বারবার ঘুরছিল একটাই প্রশ্ন—সে কি নিজের স্বপ্নকে বেছে নেবে, না নিরাপত্তাকে? এই প্রশ্নটাই তাকে ভিতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছিল।

পরিবর্তনের শুরু

পরদিন সকালে রাহুল এমন একটি সিদ্ধান্ত নেয়, যেটা তার পরিবারও আশা করেনি। সে নিরাপদ পথ ছেড়ে নিজের স্বপ্নের দিকে পা বাড়ায়। শুরুটা কঠিন ছিল। ব্যর্থতা এসেছে, ভয় এসেছে, সন্দেহও এসেছে।

জীবনের শিক্ষা

কিন্তু সময়ের সাথে সাথে রাহুল বুঝতে পারে—সব সিদ্ধান্ত ঠিক হয় না, কিন্তু সাহস না দেখালে কোনো সিদ্ধান্তই জীবন বদলায় না। এই বাংলা ছোট গল্প আমাদের শেখায়, সাহস কখনো বৃথা যায় না।

শেষ কথা

জীবনে হয়তো আজই তোমার সামনে এমন কোনো সিদ্ধান্ত অপেক্ষা করছে। তুমি কোন পথটা বেছে নেবে? নিরাপদটা, না স্বপ্নেরটা?

আরও অনুপ্রেরণামূলক লেখা পড়তে আমাদের বাংলা গল্প বিভাগটি দেখুন।