145dba
Tag

দেবব্রত বিশ্বাস

Browsing

দেবব্রত বিশ্বাস মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় কে বলেছিলেন “কেন এতদিন রবীন্দ্রসঙ্গীতের চর্চা করেননি”—এই ভেবে মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করছিল মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের। ছোটবেলা থেকেই গানের পরিবেশে বড় হওয়া, কাকা রত্নেশ্বর মুখোপাধ্যায় নিজে বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ। কীর্তন, ঠুমরি, টপ্পা—সবই আয়ত্তে। অথচ কোথায় যেন একটা ফাঁক থেকে গিয়েছিল। সেই ফাঁকটার নাম রবীন্দ্রসঙ্গীত।

আর ঠিক সেই জায়গাতেই এসে পড়ল বিপদ। ইন্টার কলেজিয়েট কম্পিটিশনে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতেই হবে। সময় হাতে নেই। প্রস্তুতি নেই। তখন মনে হচ্ছিল—এ তো মহাবিপদ!

দেবব্রত বিশ্বাস কে ছিলেন

দেবব্রত বিশ্বাস—নামটা শুনলেই রবীন্দ্রসঙ্গীতপ্রেমীদের চোখে অন্যরকম আলো জ্বলে ওঠে। অনেকেই তাঁকে চেনেন ‘জর্জ বিশ্বাস’ নামে। রবীন্দ্রনাথের গানে যাঁর উচ্চারণ, আবেগ আর সংযম এক অনন্য মানদণ্ড তৈরি করেছিল। তিনি ছিলেন এমন একজন শিল্পী, যিনি বিশ্বাস করতেন—রবীন্দ্রসঙ্গীত কেবল গান নয়, এক ধরনের সাধনা। তাই এই ধারার সঙ্গে আপস তাঁর অভিধানে ছিল না।

মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের বিপদ ও রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রয়োজন

মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় ছোটবেলা থেকেই গানের পরিবেশে বড় হয়েছেন। কীর্তন, ঠুমরি, টপ্পা—সবই তাঁর রপ্ত। কিন্তু এক জায়গায় এসে যেন হোঁচট। ইন্টার কলেজিয়েট কম্পিটিশনে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতেই হবে। সময় নেই। প্রস্তুতিও নেই। এই মুহূর্তে রবীন্দ্রসঙ্গীত যেন তাঁর কাছে পাহাড়সম বাধা। এখান থেকেই গল্পের নাটকীয়তা শুরু।

দল নেই তো বল নেই : একাকিত্ব কেন মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু

সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ে দেবব্রত বিশ্বাসের সঙ্গে ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ

উপায় বাতলে দিলেন কাকা রত্নেশ্বর মুখোপাধ্যায়—সরাসরি দেবব্রত বিশ্বাসের কাছে যেতে। ভোরবেলা হাজির হওয়া হল সাদার্ন অ্যাভিনিউ-এর বাড়িতে। মশারি টাঙানো ঘর, নিস্তব্ধ পরিবেশ। সব দেখে বোঝা যায়—গৃহস্থালি নয়, সঙ্গীতই এই মানুষের আসল সংসার। এক অচেনা মানুষকে ঘুম থেকে তুলে গান শেখার আবদার—যে কোনো মানুষেরই রাগ হওয়ার কথা।

এক ভোরে দেবব্রত বিশ্বাসের কাছে রবীন্দ্রসঙ্গীত শেখা

রাগ হয়েছিল। কিন্তু তা বেশিক্ষণ টেকেনি। সময়টা তখন অন্যরকম ছিল, মানুষগুলোও তাই। মানবেন্দ্রর কাতর অনুরোধ শুনে দেবব্রত বিশ্বাস রাজি হয়ে গেলেন। শুরু হল ‘ধরা দিয়েছি গো আমি আকাশেরও পাখি’। বারবার থামানো, আবার তোলা, আবার শুধরে দেওয়া। গানের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি টান—সবকিছুর মধ্যেই ছিল কঠোর শুদ্ধতা। অফিস যাওয়ার সময় হলেও শেখানো থামেনি। দায়িত্ব বুঝে বোনকে বলে গিয়েছিলেন—গান ঠিক না হওয়া পর্যন্ত ছাড় নেই।

ইন্টার কলেজিয়েট কম্পিটিশনে রবীন্দ্রসঙ্গীত ও বিচারকদের চমক

বিকেলে কম্পিটিশন। সেখানে গিয়ে মানবেন্দ্রর চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। বিচারকদের আসনে বসে আছেন অনাদি দস্তিদার, শৈলজারঞ্জন মজুমদার—আর সঙ্গে দেবব্রত বিশ্বাস নিজেই। সকালে যাঁর কাছে শিখেছেন, বিকেলে তিনিই বিচারক! গান গাওয়া হল। কোনও মতে উতরে গেল রবীন্দ্রসঙ্গীত। উত্তেজনা, ভয়—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত মুহূর্ত।

দেবব্রত বিশ্বাস কেন নম্বর দেওয়া থেকে বিরত ছিলেন

নৈতিকতার জায়গাটাই এখানে সবচেয়ে উজ্জ্বল। দেবব্রত বিশ্বাস স্পষ্ট বুঝেছিলেন—চেনা মানুষকে বিচার করা উচিত নয়। তাই নম্বর দেওয়া থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলেন। কোনও নাটক নয়, কোনও ঘোষণা নয়—নীরব সিদ্ধান্ত। কিন্তু বাকি বিচারকদের বিচারে মানবেন্দ্রই প্রথম। এখানে দেবব্রত বিশ্বাস শুধু একজন শিল্পী নন, একজন আদর্শ মানুষের প্রতীক হয়ে ওঠেন।

“রবীন্দ্রসঙ্গীত আপনার জন্য নয়”—গুরুবাক্যের গভীর অর্থ

পরে ধন্যবাদ জানাতে গেলে যে কথা তিনি বলেছিলেন, তা কঠিন হলেও নির্মম ছিল না—
“রবীন্দ্রসঙ্গীত আপনার জন্য নয়। কথা দিন, এই প্রথম আর শেষ।”
এটা অপমান নয়। এটা ছিল শিল্পের প্রতি দায়িত্ববোধ। দেবব্রত বিশ্বাস বুঝেছিলেন—সবাই সবকিছুর জন্য তৈরি হয় না। রবীন্দ্রসঙ্গীতের মতো সূক্ষ্ম ধারায় জোর করে ঢোকা উচিত নয়। এই সততাই তাঁকে আলাদা করে।

দেবব্রত বিশ্বাস ও তখনকার মানুষের মূল্যবোধ

আজকের দিনে এমন ঘটনা প্রায় অকল্পনীয়। ভোরবেলা অচেনা মানুষকে শেখানো, বিচারক হয়ে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া, আর শেষে সত্য কথাটা নির্দ্বিধায় বলে দেওয়া—সব মিলিয়ে এক অন্য সময়ের ছবি। দেবব্রত বিশ্বাস সেই সময়ের প্রতিনিধি, যেখানে শিল্পের আগে অহং আসেনি, আর নীতির সঙ্গে আপস ছিল না।

বললাম না, তখনকার মানুষগুলো সত্যিই অন্যরকম ছিলেন।