145dba
Tag

নাস্তিকতা ও সমাজ

Browsing

ধর্মহীন সমাজ ও অপরাধ প্রবণতা: সত্যিই কি ধর্ম ছাড়া সমাজ ভেঙে পড়ে?

ধর্মহীন সমাজ ও অপরাধ প্রবণতা—এই দুটো বিষয় নিয়ে আমাদের দেশে এক ধরনের ভয় কাজ করে। ছোটবেলা থেকেই আমাদের শেখানো হয়, ধর্ম না থাকলে মানুষ নৈতিকতা হারায়, সমাজ উচ্ছন্নে যায়। কিন্তু বাস্তব পৃথিবীর কিছু দেশের অভিজ্ঞতা সেই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। বিশেষ করে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো দেখাচ্ছে, ধর্ম ছাড়াও সমাজ শৃঙ্খলিত, মানবিক ও নিরাপদ হতে পারে।

ধর্মহীন সমাজ ও অপরাধ প্রবণতা: স্ক্যান্ডিনেভিয়ান অভিজ্ঞতা

সুইডেন ও ডেনমার্কের মতো দেশগুলোতে ঈশ্বরে বিশ্বাসের হার অত্যন্ত কম। সুইডেনে প্রায় ৮৫% এবং ডেনমার্কে প্রায় ৮০% মানুষ নিজেদের ধর্মহীন বা নাস্তিক বলে পরিচয় দেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই দেশগুলোই পৃথিবীর সবচেয়ে কম অপরাধপ্রবণ ও কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় উপরের দিকে থাকে।

বেদের আলোকে গোহত্যা ও গোমাংস ভক্ষণ

সুইডেনে কম অপরাধ ও কারাগার বন্ধের বাস্তবতা

সুইডেনের কারাগারগুলোতে বন্দির সংখ্যা ক্রমাগত কমছে। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে সরকারকে কিছু কারাগার বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। যদি ধর্মহীনতা সমাজ ধ্বংস করত, তাহলে এই চিত্র কি সম্ভব হতো?

ধর্ম বনাম নৈতিকতা: কোনটা আসলে সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করে?

আমাদের মতো ধর্মবিশ্বাসী দেশগুলোতে ঈশ্বর, আল্লাহ বা ভগবানের ভয়কে নৈতিকতার মূল ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, শুধুমাত্র ধর্মীয় বিশ্বাস অপরাধ বা দুর্নীতি কমাতে পারে না।

ধার্মিক দেশ ও দুর্নীতির বাস্তব চিত্র

ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তানের মতো গভীরভাবে ধর্মবিশ্বাসী দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরেই দুর্নীতির তালিকায় শীর্ষে বা কাছাকাছি অবস্থান করছে। এখানেই প্রশ্ন ওঠে—ধর্ম যদি অপরাধ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হতো, তাহলে এই দেশগুলোর পরিস্থিতি ভিন্ন হতো না কেন?

Society without God: গবেষণা কী বলছে?

২০০৫–২০০৬ সালে সমাজবিজ্ঞানী ফিল জুকারম্যান পূর্ব ইউরোপ ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলোতে গবেষণা চালান। তাঁর গবেষণা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে লেখা বই Society without God-এ উঠে আসে এক চমকপ্রদ বাস্তবতা।

ডেনমার্কের আরহাস শহরের অভিজ্ঞতা

ডেনমার্কের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর আরহাসে প্রায় এক মাস থাকার সময় তিনি হাতে গোনা কয়েকবার পুলিশের গাড়ি দেখেছিলেন। ২৫ লক্ষাধিক মানুষের শহরে পুরো এক বছরে মাত্র একটি খুনের ঘটনা রিপোর্ট হয়েছিল। এই তথ্য ধর্মহীন সমাজ ও অপরাধ প্রবণতা বিষয়ে প্রচলিত ধারণাকে ভেঙে দেয়।

ধর্মহীন সমাজ ও অপরাধ প্রবণতা: সুখ সূচকের সঙ্গে সম্পর্ক

৯১টি দেশের ওপর করা এক জরিপে দেখা গেছে, ডেনমার্ক বিশ্বের সবচেয়ে সুখী দেশগুলোর একটি। সেখানে মানুষ পাপ, পরকাল, বেহেশত বা দোজখের ধারণায় বিশ্বাস না করেও সুখে ও শান্তিতে বসবাস করছে।

কেন তারা বেশি সুখী?

  • উচ্চ গড় আয়ু
  • উন্নত স্বাস্থ্যসেবা
  • শিক্ষার উচ্চ হার
  • লিঙ্গসমতা
  • সামাজিক নিরাপত্তা
  • পরিবেশ সচেতনতা

এই সবকিছু মিলিয়েই ধর্ম ছাড়াও একটি সুস্থ সমাজ গড়ে উঠেছে।

ধর্ম ছাড়াও নৈতিক সমাজ কি সম্ভব?

স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর মানুষ মনে করে, ভালো মানুষ হতে ঈশ্বরভীতি অপরিহার্য নয়। তারা যুক্তিবাদ, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেয়।

যুক্তি ও বাস্তবতার ওপর ভরসা

এই দেশগুলোতে সমস্যা আছে, তবে সমাধান খোঁজা হয় বাস্তব ও যৌক্তিক পথে। তারা কাল্পনিক শক্তির ওপর নির্ভর না করে সামাজিক কাঠামো ও নীতিনির্ধারণের মাধ্যমে সমস্যা মোকাবিলা করে।

অপরাধী কারা: গবেষণার চমকপ্রদ তথ্য

ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি ১৯৮৮ সালে ভারতের জেলখানায় এক সমীক্ষা চালায়। ফলাফল ছিল চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোর মতো—জেলবন্দিদের শতভাগই কোনো না কোনো ধর্মে বিশ্বাসী।

আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান কী বলছে?

আমেরিকায় করা এক সমীক্ষায় দেখা যায়, জেল হাজতে নাস্তিকের সংখ্যা মাত্র ০.২%। অর্থাৎ ঈশ্বরভীতি বা পরকালের ভয় অপরাধীদের অপরাধ থেকে নিবৃত্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে।

ধর্মহীন সমাজ ও অপরাধ প্রবণতা: আসল শিক্ষা কী?

এই আলোচনার উদ্দেশ্য ধর্মকে আক্রমণ করা নয়। বরং প্রশ্ন তোলা—নৈতিকতা, মানবিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ কি শুধুই ধর্মনির্ভর?

শেষ কথা

ধর্মহীন সমাজ ও অপরাধ প্রবণতা নিয়ে ভয় দেখানো ধারণা বাস্তব তথ্যের সঙ্গে মেলে না। সুইডেন ও ডেনমার্ক প্রমাণ করেছে, ধর্ম ছাড়াও একটি সমাজ শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক ও সুখী হতে পারে। আসল শক্তি আসে শিক্ষা, যুক্তিবাদ ও মানবিক মূল্যবোধ থেকে—ধর্ম থাকুক বা না থাকুক।