আজকাল বাচ্চাদের স্কুল মানেই দামী স্কুল, আর সারা বছর জুড়ে নানান ধরনের অনুষ্ঠান। এসবের খবর আমরা পাই বিভিন্ন মায়েদের গ্রুপের পোস্ট থেকে, আবার অনেক সময় পেশেন্টদের কথাতেও শুনি।
এই সব কার্যকলাপ বা activity-র উদ্দেশ্য বলা হয়—খেলার ছলে বাচ্চাদের শেখানো।
কিন্তু বাস্তবে এই স্কুলের ইভেন্ট কালচার বাবা-মায়ের উপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
প্রায় প্রতিটি ইভেন্টের জন্য কিছু না কিছু প্রস্তুত করতে হয়—জামাকাপড়, খাবার, সাজসজ্জা। সময় আর টাকার দুটোই দরকার।
ধরুন, স্কুলের ইভেন্ট কালচার “Yellow Day”। বাচ্চাদের হলুদ জামা পরে যেতে হবে, হলুদ রঙ চিনবে।
আবার কখনো “Mango Day”, কখনো মা দিবস, বাবা দিবস। এইসব অনুষ্ঠানে বাবা-মাকেও স্কুলে যেতে বলা হয়।
ভালো দিক অবশ্যই আছে। ছোট বাচ্চারা এতে খেলতে খেলতে কিছু শেখে।
কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন উপলক্ষটাই লক্ষ্য থেকে বড় হয়ে যায়।
বাচ্চাদের মন খুবই সংবেদনশীল।
একজন মা একদিন মেয়েদের গ্রুপে লিখেছিলেন—তার বাচ্চার স্কুলে “Mango Day” ছিল।
তিনি ভুলে গিয়েছিলেন আম দিয়ে টিফিন পাঠাতে।
ফলাফল?
সেদিন দিদিমণি বাচ্চাটিকে টিফিন খেতে দেননি।
এই ঘটনায় বাচ্চাটি শুধু ক্ষিদেয় কষ্ট পায়নি, অপমানিতও হয়েছে।
হয়তো তার মনে হয়েছে—মা কি তাহলে তাকে যথেষ্ট ভালোবাসেন না?
অথচ বাস্তবটা ঠিক উল্টো।
বাবা-মা ব্যস্ত বলেই তো এমন স্কুলে বাচ্চাকে পড়াতে পাঠান।
শতাব্দী দাস সম্প্রতি মা দিবস ও বাবা দিবস নিয়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা বলেছেন।
এই ধরনের অনুষ্ঠান বড় করে পালন করলে single parent পরিবারের বাচ্চাদের মনে গভীর আঘাত লাগে।
মাসি, পিসি, ভাই-বোন পাতানো যায়।
কিন্তু মা বা বাবা—তাদের জায়গা কেউ নিতে পারে না।
আর একটা সত্য কথা হলো—এই স্কুলের ইভেন্ট কালচার পুরোপুরি শিক্ষার জন্য নয়।
এর সঙ্গে অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যও জড়িয়ে আছে।
অনেক স্কুলেই এইসব অনুষ্ঠানের জন্য বাবা-মাকে আলাদা করে জিনিসপত্র কিনতে হয়।
সব পরিবার যে সেই খরচ বহন করতে পারে, তা নয়।
এই সব ভাবতে ভাবতেই নিজের স্কুলের কথা মনে পড়ে যায়।
সরকারি স্কুল।
তখন সরকারি স্কুল মানেই ছিল আলাদা সম্মান।
আমাদের দিদিমণিরা সব সময় একটা কথা মাথায় রাখতেন—
এই স্কুলে সব রকম আর্থিক ও সামাজিক স্তরের বাচ্চারা পড়ে।
কোনো হাতের কাজের জিনিস আনতে বললেও পরিষ্কার করে বলা হতো—
“বাবা-মা না পারলে চাপ দেবে না।”
আর দামী জিনিস স্কুলে আনা একেবারেই নিষেধ ছিল।
কারণ, একজনের দামী জিনিস আরেকজনের মনে কষ্ট দিতে পারে।
স্কুলে ঢুকলে সবাই সমান—এই শিক্ষাটাই ছিল সবচেয়ে বড়।
এই কথাগুলো একদিনে শেখানো হয়নি।
বারবার বলা হয়েছে। তাই মনে গেঁথে গেছে।
আমি দাবি করছি না যে সরকারি স্কুলে কখনো অমানবিক আচরণ হয়নি।
আমি শুধু আমার স্কুলের সেই বিশেষ শিক্ষার কথাই বলছি।
মানুষের অনুভূতিতে আঘাত না দেওয়া।
কারো দুর্বলতার সামনে নিজের বিত্ত প্রদর্শন না করা।
বাবা-মায়ের সীমাবদ্ধতা বোঝা।
আজকের স্কুলের ইভেন্ট কালচার কি এই মানবিক শিক্ষা দিচ্ছে?
নাকি শিশুদের বোঝাচ্ছে—খুশি থাকতে হলে বেশি বেশি জিনিস দরকার?
Yellow Day-তে হলুদ জামা না থাকলে লজ্জা।
Mango Day-তে আম না আনলে অপমান।
জন্মদিনে উপহার না আনলে ছোট হয়ে যাওয়া।
এর চেয়ে অনেক বেশি জরুরি হলো—
শিশুকে মানবিক অনুভূতি শেখানো।
লেখক – অরুণিমা ঘোষ
