145dba
Tag

হিমু ইতিহাস

Browsing

হিমু ভারতের নেপোলিয়ন—এই নামটা আজও ইতিহাসে বিতর্ক আর বিস্ময়ের জন্ম দেয়। ১৬শ শতকের মধ্যভাগে, যখন উত্তর ভারতে মুঘল শক্তি আবার পা জমাতে চাইছে, তখন এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া মানুষ মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে দিল্লির সিংহাসনে বসেছিলেন। তিনি ছিলেন হেমচন্দ্র বিক্রমাদিত্য, ইতিহাসে যিনি পরিচিত হিমু ভারতের নেপোলিয়ন নামে।
কিন্তু ভাগ্যের এক মুহূর্তের ভুল, একটি তীর—সবকিছু বদলে দেয়।

হিমু ভারতের নেপোলিয়ন কে ছিলেন? (সংক্ষিপ্ত পরিচয়)

হেমচন্দ্র ওরফে হিমুর জন্ম বর্তমান হরিয়ানার রিওয়ারি অঞ্চলে। পরিবার ছিল সাধারণ—পেশায় মুদি ব্যবসা। কিন্তু হিমু ভারতের নেপোলিয়ন হয়ে ওঠেন তার অসাধারণ প্রশাসনিক দক্ষতা, কৌশলী বুদ্ধি আর একের পর এক যুদ্ধজয়ের মাধ্যমে।

ইতিহাসবিদদের মতে, তিনি জীবনে প্রায় ২২টি যুদ্ধে জয়ী হয়েছিলেন। এই ধারাবাহিক সাফল্যই তাকে “মধ্যযুগের নেপোলিয়ন” উপাধি এনে দেয়।

সাধারণ জীবন থেকে ক্ষমতার শিখরে: হিমু ভারতের নেপোলিয়ন

শের শাহ সুরির প্রশাসনে কাজ করার সময় থেকেই হিমুর প্রতিভা নজরে আসে। পরে ইসলাম শাহ এবং আদিল শাহের আমলে তিনি আরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান।

প্রশাসক হিসেবে হিমু

  • গোয়েন্দা বিভাগ পরিচালনা
  • ডাক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন
  • রাজস্ব ও সামরিক সিদ্ধান্তে সরাসরি অংশগ্রহণ

এই সময়েই হিমু ভারতের নেপোলিয়ন হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন ক্ষমতার অলিন্দে।

সমুদ্র মন্থন ও কুম্ভ মেলার গল্প: কুম্ভ মেলা কি সত্যিই অমৃতের সঙ্গে যুক্ত?

দিল্লি দখল ও বিক্রমাদিত্য উপাধি

১৫৫৬ সালে দিল্লিতে মুঘল শাসন দুর্বল হয়ে পড়লে, আদিল শাহ হিমুকে দায়িত্ব দেন উত্তর ভারতে মুঘলদের উৎখাত করতে।
হিমু বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে দিল্লি অভিযান করেন এবং সফল হন।

দিল্লি দখলের পর—

  • তিনি “বিক্রমাদিত্য” উপাধি গ্রহণ করেন
  • নিজের নামে মুদ্রা চালু করেন
  • হিন্দু রাজ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন

এই সময়েই হিমু ভারতের নেপোলিয়ন ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন।

পানিপথের পথে অগ্রযাত্রা: আত্মবিশ্বাস বনাম সতর্কতা

দিল্লি দখলের পর হিমু জানতেন, মুঘলরা চুপ করে বসে থাকবে না। অন্যদিকে, কিশোর বয়সের সম্রাট আকবর তখন অভিভাবক বৈরাম খাঁ–এর নেতৃত্বে পাল্টা আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

হিমু সিদ্ধান্ত নেন, যুদ্ধ হবে পানিপথ–এ।

পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ ও হিমু ভারতের নেপোলিয়ন

যুদ্ধের শুরু

পানিপথের ময়দানে হিমুর বাহিনী ছিল সংখ্যায় বেশি, অভিজ্ঞতায় এগিয়ে।
হাতির পিঠে বসে, কোনো বর্ম ছাড়াই যুদ্ধ পরিচালনা করছিলেন হিমু ভারতের নেপোলিয়ন—সাহসী, কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত।

একটি তীর, একটি মুহূর্ত

যুদ্ধ যখন হিমুর দিকেই ঝুঁকছে, ঠিক তখনই—
একটি তীর এসে তার চোখে লাগে।
এই আঘাতে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন।

সেনাপতি আহত—এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই তার সেনাবাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়ে।

হিমু ভারতের নেপোলিয়নের পরাজয়ের আসল কারণ

অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, এই পরাজয় ছিল ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। তবে বাস্তব কারণগুলো ছিল—

১. বর্ম না পরা

হিমু ইচ্ছাকৃতভাবে বর্ম পরেননি, যাতে সৈন্যরা তাকে দেখতে পায়।
কিন্তু এই সিদ্ধান্তই প্রাণঘাতী হয়।

২. অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস

একাধিক যুদ্ধে জয় হিমুকে কিছুটা আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছিল।

৩. নেতৃত্ব শূন্যতা

হিমু আহত হওয়ার পর সেনাবাহিনীর মধ্যে নেতৃত্বের সংকট তৈরি হয়।

হিমু ভারতের নেপোলিয়নের মৃত্যু

আহত অবস্থায় হিমুকে ধরে আনা হয় আকবরের সামনে।
কিছু ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, আকবর নিজে দ্বিধায় ছিলেন। শেষ পর্যন্ত বৈরাম খাঁর নির্দেশেই হিমুর শিরোচ্ছেদ করা হয়

এভাবেই শেষ হয় হিমু ভারতের নেপোলিয়ন–এর জীবন।

ইতিহাসে হিমু ভারতের নেপোলিয়নের মূল্যায়ন

আজও বিতর্ক চলেই—

  • যদি সেই তীর না লাগত?
  • যদি পানিপথে সেদিন ভাগ্য একটু সহায় হতো?

অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, হিমু বেঁচে থাকলে উত্তর ভারতের ইতিহাস অন্যরকম হতে পারত।
একটি সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে দিল্লির সিংহাসনে বসা—এই উত্থানই তাকে আলাদা করে।

উপসংহার

হিমু ভারতের নেপোলিয়ন ছিলেন সাহস, দক্ষতা আর উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতীক।
তার পরাজয় শুধু একটি যুদ্ধের হার নয়—এটা ছিল ইতিহাসের মোড় ঘুরে যাওয়ার মুহূর্ত।

একটি ছোট ভুল, একটি তীর—আর ভারতের ইতিহাস নতুন পথে হাঁটতে শুরু করে।