Bengali Tech News AI Apps Smartphone Updates ব ল ড জ ট ল(1)
Smartphone News

রবীন্দ্রনাথ বুর্জোয়া কবি—এই অভিযোগ কি সত্য?

Pinterest Telegram WhatsApp

রবীন্দ্রনাথ বুর্জোয়া কবি—এই অভিযোগের উৎস কোথায়

“রবীন্দ্রনাথ বুর্জোয়া কবি”—এই অভিযোগটা আজকাল যেভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে, সেটা মূলত রাজনৈতিক প্রচার। বিশেষ করে দক্ষিণপন্থী বয়ানে এটি এমনভাবে হাজির করা হয়, যেন গোটা বামপন্থী আন্দোলনই রবীন্দ্রনাথকে পরিকল্পিতভাবে বাতিল করে দিয়েছিল। বাস্তবে কিন্তু বিষয়টা এত সরল নয়।

এই অভিযোগের উৎস খুঁজতে গেলে আমাদের যেতে হয় চল্লিশের দশকের বামপন্থী সাহিত্য বিতর্কের ভেতরে। সেখানে কিছু মার্কসবাদী সমালোচক রবীন্দ্রনাথের দর্শন, ভাববাদ এবং শ্রেণি-অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। কিন্তু সেই প্রশ্ন তোলা আর “গালাগালি” এক জিনিস নয়। এই পার্থক্যটাই ইচ্ছাকৃতভাবে মুছে ফেলা হয়েছে।

ভবানী সেনের মূল্যায়ন: প্রেক্ষাপট ও সীমাবদ্ধতা

‘মার্কসবাদী’ পত্রিকায় “বাংলা প্রগতি সাহিত্যের আত্মসমালোচনা” প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে সমালোচনামূলক ভাষা ব্যবহার করেছিলেন ভবানী সেন (ছদ্মনাম: রবীন্দ্র গুপ্ত)। সেখানে “বুর্জোয়া”, “ভাববাদী” ইত্যাদি শব্দের ব্যবহার দেখা যায়।

কিন্তু দুটো বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার।
প্রথমত, এটি ছিল একজন সমালোচকের ব্যক্তিগত বিশ্লেষণ, কোনো দলীয় ঘোষণাপত্র নয়।
দ্বিতীয়ত, ওই সময়ে মার্কসবাদী সাহিত্য সমালোচনায় শ্রেণি–বিশ্লেষণ ছিল একটি প্রচলিত তাত্ত্বিক টুল। “বুর্জোয়া” শব্দটি তখন আজকের মতো গালি হিসেবে নয়, বরং একটি দার্শনিক ক্যাটাগরি হিসেবে ব্যবহৃত হত।

এই সীমাবদ্ধতা না বুঝে পুরো বামপন্থী চিন্তাকে একাকার করে দেখানোটা ইতিহাসের সঙ্গে অসৎ ব্যবহার।

রবীন্দ্রনাথ নিজে কি নিজেকে বুর্জোয়া ভাবতেন

এখানে একেবারে প্রাথমিক উৎসে যাওয়া যাক।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেই একটি চিঠিতে (১৭.০৩.১৯৩৯, অমিয় চক্রবর্তীকে লেখা) স্পষ্টভাবে বলেন—

“শ্রেণীওয়ালাদের মতে এসব কবিতা হয়তো প্রোলিটেরিয়েট, কিন্তু আমি তো জাত-বুর্জোয়া…”

এই বক্তব্য থেকে দুটো জিনিস পরিষ্কার।
এক—রবীন্দ্রনাথ নিজের সামাজিক শ্রেণি সম্পর্কে বিভ্রান্ত ছিলেন না।
দুই—তিনি শ্রেণিগত অবস্থান স্বীকার করলেও শিল্পমূল্যকে সেখানে সীমাবদ্ধ করেননি।

অর্থাৎ, বুর্জোয়া শ্রেণিতে জন্ম নেওয়া মানেই বুর্জোয়া চেতনার প্রচারক—এই সরল সমীকরণ তিনি নিজেই মানতেন না।

বেদের আলোকে গোহত্যা ও গোমাংস ভক্ষণ

কমিউনিস্ট পার্টির সামগ্রিক অবস্থান কী ছিল

ভবানী সেনের লেখা থেকেই যদি গোটা কমিউনিস্ট পার্টির অবস্থান নির্ধারণ করা হয়, তাহলে সেটা হবে ঐতিহাসিক ভুল। অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির বহু নেতা রবীন্দ্রনাথকে গভীর শ্রদ্ধার চোখেই দেখেছেন।

বিশেষ করে ১৯৪১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রান্ত হওয়ার পর বামপন্থী আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা একেবারে ভিন্ন ছবি দেখায়। পার্টির নীতি, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এবং রবীন্দ্রনাথের অবস্থানের মধ্যে তখন স্পষ্ট সংযোগ তৈরি হয়।

রবীন্দ্রনাথ ও সোভিয়েত ইউনিয়ন: সম্পর্ক ও সমর্থন

হিটলার সোভিয়েত আক্রমণের পর গঠিত হয় “ফ্রেন্ডস অফ সোভিয়েত ইউনিয়ন”। এই সংগঠনের পৃষ্ঠপোষক হতে রাজি হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ—যখন তাঁর শরীর ভেঙে পড়েছে, তখনও।

তিনি শুধু নামমাত্র সমর্থন দেননি। বরং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে কমিউনিস্টদের সাবধান করে দিয়েছিলেন এবং পার্টির প্রস্তাব পড়ে পুলকিত হয়েছিলেন। এই ঘটনাগুলো দেখায় যে রবীন্দ্রনাথ বাস্তব রাজনৈতিক প্রশ্নে সমাজবাদী শক্তির পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, যদিও তিনি কোনো দলীয় রাজনীতির মানুষ ছিলেন না।

ভবানী সেনের পরবর্তী অবস্থান পরিবর্তন

পরবর্তীকালে ভবানী সেন নিজেই তাঁর আগের মূল্যায়ন অনেকটাই সংশোধন করেন। “একজন মনস্বী ও একটি শতাব্দী” প্রবন্ধে তিনি স্বীকার করেন—রবীন্দ্রনাথ ভাববাদের সীমা অতিক্রম করে মানব জীবনের গভীর সত্যকে শিল্পে রূপ দিতে পেরেছিলেন।

এখানে রবীন্দ্রনাথকে আর যান্ত্রিক শ্রেণি–চশমায় দেখা হয়নি। বরং “মহান শিল্পী” হিসেবে তাঁর স্বাতন্ত্র্য স্বীকার করা হয়েছে। এই আত্মসমালোচনা প্রমাণ করে যে আগের মূল্যায়নকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ধরা যায় না।

রবীন্দ্রনাথ ও সমাজবাদ নিয়ে সংশয় ও উপলব্ধি

রবীন্দ্রনাথ আজীবন প্রশ্ন করেছেন—সমাজবাদ কীভাবে মানবিক হবে, ক্ষমতা কীভাবে মানুষের ওপর চেপে বসবে না। তাঁর সংশয় ছিল, কিন্তু তা বিরোধিতা ছিল না।

জীবনের শেষ দিকে এসে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি তাঁর বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়। মৃত্যুশয্যায় শুয়ে তিনি যুদ্ধের খবর শুনে আনন্দিত হতেন এবং বলেছিলেন—“সোভিয়েত কখনো হার মানবে না।” এই বিশ্বাস নিছক কাব্যিক আবেগ নয়, রাজনৈতিক উপলব্ধির ফল।

রবীন্দ্রনাথ বুর্জোয়া কবি—মিথ না বাস্তব

সব দিক মিলিয়ে বলা যায়—
হ্যাঁ, রবীন্দ্রনাথ বুর্জোয়া শ্রেণিতে জন্মেছিলেন।
কিন্তু না, তাঁকে “বুর্জোয়া কবি” বলে বাতিল করে দেওয়া যায় না।

এই অভিযোগকে যেভাবে আজ রাজনৈতিক অস্ত্র বানানো হয়েছে, তা মূলত অর্ধসত্যের অপপ্রচার। ইতিহাস, চিঠিপত্র, দলীয় নথি ও পরবর্তী মূল্যায়ন—সব মিলিয়ে দেখা যায়, রবীন্দ্রনাথ ছিলেন শ্রেণির ঊর্ধ্বে উঠে মানবতার কবি।

আর ঠিক এই কারণেই তিনি একপক্ষের সম্পত্তি নন—তিনি প্রশ্নের, বিতর্কের, আর মুক্ত চিন্তার।

Write A Comment